দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার ভবনে সহিংসতা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করলেও হামলায় নেতৃত্বদানকারীদের অনেকেই এখনো ধরা পড়েননি।
টাইমস অব বাংলাদেশ হামলার মোট পাঁচটি ভিডিও ফুটেজ দেখে ১৮ জনকে শনাক্ত করেছে, যারা সম্মুখভাগ থেকে পত্রিকা দুটির অফিসে হামলা চালায়। এদের অধিকাংশই যুবক হলেও কয়েকজন মধ্যবয়সী ছিলেন।
গত ১৮ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু হলে একদল উশৃঙ্খল দুর্বৃত্ত প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে আগুন দেয়।
ওই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দুই মিডিয়া পৃথক মামলা করেছে। এতে প্রায় ৯০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেকে প্রথম আলোতে তাণ্ডব চালিয়ে পরে ডেইলি স্টারে যায়। দুই গণমাধ্যমে হামলায় জড়িত ৩১ জনকে ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ শনাক্ত করেছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলো ভবনে একদল হামলাকারী ভাঙচুর চালিয়ে ভেতরে ঢুকে লুটপাট করে এবং পরে আগুন দেয়। এরপরই ডেইলি স্টার সেন্টারে অনুরূপ ঘটনা ঘটে। দুই ঘটনার বহু প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ঘটনাস্থলে সম্মুখসারিতে বেশ কয়েকজনের তৎপরতা ও বক্তব্য স্পষ্ট হলেও তারা এখনো ধরা পড়েনি।
প্রথম আলোতে যারা সম্মুখসারিতে
২১ ডিসেম্বর রাত ১২টার পর তেজগাঁও থানায় প্রথম আলো সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মামলা করেছে। এতে অজ্ঞাতনামা ৪০০–৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১১টার দিকে ২০–৩০ জন অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও দাহ্য পদার্থ নিয়ে মিছিল করে কাওরান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে এসে হামলার চেষ্টা চালায়। পুলিশ বাধা দিলে তারা বেআইনিভাবে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে সমবেত হয়ে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী স্লোগান দেয়। বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তারা লোক জড়ো করে এবং প্রথম আলোতে হামলার জন্য উসকানিমূলক পোস্ট দিতে থাকে। ওই ঘটনায় ৩২ কোটি টাকার মালামাল ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি ইটিভিসহ কয়েকটি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। মাথায় পাগড়ি, বাবরি চুল ও দাঁড়িওয়ালা মধ্যবয়সী ওই ব্যক্তি সাদা পাঞ্জাবি ও তার ওপর কটি পরা ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার ভারতের ল্যাসপেন্সার। দেখো বাংলাদেশ, দেখো বিশ্ব—হাদিরা ঘুমায় নাই। আমরা অন্য টিভি সংবাদমাধ্যম ভাঙব না। কারণ, এগুলো আমাদের প্রতিষ্ঠান, কিন্তু প্রথম আলো দিল্লির।’ নিজেকে চার সন্তানের বাবা দাবি করে তিনি প্রয়োজনে ওসমান হাদির সন্তানের দায়িত্ব নিতে রাজি বলেও জানান।
স্যান্ডো গেঞ্জি পরা এক ব্যক্তির মাথায় বড় কালো চুল ছিল এবং পরনে ছিল সবুজ রঙের প্যান্ট। তিনি ভাঙচুর চালিয়ে সরাসরি আগুন দেন। কালো জ্যাকেট ও কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তির মাথার চুল ছোট ছিল। তাকে প্রথম আলো ভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে দেখা যায়।
আকাশি রঙের গেঞ্জির ওপর খাকি রঙের জ্যাকেট পরা এক ব্যক্তির হাতে বড় বাঁশ ছিল। তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ, প্রথম আলো নিপাত যাক’ স্লোগান দেন।
গেঞ্জি পরা এক ব্যক্তি ঘটনার সময় বলেন, ‘এটাকে মব বলা হচ্ছে—শুনে আমার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছে।’ উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এটা মব হয় কীভাবে? মব কাকে বলে?’
মাথায় টুপি ও চোখে চশমা পরা এক ব্যক্তির মুখে কালো দাড়ি ছিল। সাদা পাঞ্জাবি ও ধূসর চাদর পরা ওই ব্যক্তি কারওয়ান বাজারে উচ্চস্বরে বলেন, ‘এরা ভারতের দালাল। ভারতের দালাল কাউকে থাকতে দেওয়া হবে।’
প্রথম আলো ভবনের দ্বিতীয় তলায় বোতাম খোলা অবস্থায় সাদা শার্ট পরা এক যুবক ভাঙচুর চালান এবং নিচের জনতার দিকে উল্লসিত ভঙ্গিতে স্লোগান দেন।
সবুজ রঙের জ্যাকেট ও জিন্স প্যান্ট পরা এক ব্যক্তি প্রথম আলো ভবনের সামনে জ্বালানো আগুনে ভেতর থেকে বিভিন্ন জিনিস এনে দেন। তিনি দুই হাত ওপরে তুলে নৃত্য করেন। ভবনের দ্বিতীয় তলায় নীল জ্যাকেট ও কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তিকে লুটপাট চালাতে দেখা যায়।
দ্বিতীয় তলায় সাদা টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি ফায়ার এক্সটিংগুইশার ভাঙচুর করেন। তার মাথায় কালো রঙের বাবরি চুল ছিল।
ভবনের সামনে পায়জামা পরা এক ব্যক্তির পাঞ্জাবির ওপর সাদা টি-শার্ট ছিল। ওই টি-শার্টে লেখা ছিল ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে’। তাকে উল্লাস প্রকাশ করে নৃত্যরত অবস্থায় মেট্রোরেলের দিকে যেতে দেখা যায়।
ডেইলি স্টার ভাঙচুরে তৎপর যারা
ডেইলি স্টারের অপারেশনস প্রধান মিজানুর রহমানের সোমবার রাতে করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৩৫০–৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, শুক্রবার রাত আনুমানিক ১২টা ৩৫ মিনিটে লাঠিসোঁটা ও দাহ্য পদার্থ নিয়ে একদল হামলাকারী উসকানিমূলক স্লোগান দিতে দিতে ভবনে প্রবেশ করে। তারা ডেইলি স্টারের কর্মীদের ওপর শারীরিক হামলা চালায় এবং নগদ অর্থ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম লুট করার পাশাপাশি ভবনের একাধিক তলায় আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও সিসিটিভিসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও নষ্ট করা হয়।
এ ঘটনায় প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের ২০০টির বেশি ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও ৩৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ লুট করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
ডেইলি স্টারের নিচতলায় ভাঙচুর চালানো এক তরুণের মাথার চুল ছোট ছিল এবং তার পরনে ফুল হাতা সাদা চেক শার্ট ছিল। তিনি উল্লাস করে ‘দিল্লি না ঢাকা—ঢাকা ঢাকা’ স্লোগান দেন।
গলায় ফিলিস্তিনের পতাকা জড়ানো ও মাথায় কালো হেলমেট পরা এক ব্যক্তি কালো প্যান্ট ও ধূসর রঙের ব্লেজার পরিহিত ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় তলায় বাঁশের লাঠি দিয়ে ভাঙচুর করেন।
মাথায় টুপি ও মুখে মাস্ক পরা এক ব্যক্তির পরনে কালো প্যান্ট ও হাফহাতা ধূসর টি-শার্ট ছিল। তাকে ভাঙচুর চালিয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়। মাথায় ছোট চুল ও কালো জ্যাকেট এবং কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তি বাঁশ দিয়ে ডেইলি স্টারের দ্বিতীয় তলার কাচের দেয়াল ভাঙেন।
ধূসর রঙের হুডি ও কালো প্যান্ট পরা এক তরুণ নিচতলায় ভাঙচুর চালান এবং আরেকজনকে টেনে এনে ভাঙচুরে যুক্ত করেন। দ্বিতীয় তলায় ঘন সবুজ রঙের টি-শার্ট ও মাথায় টুপি পরা এক ব্যক্তি চেয়ার দিয়ে ভাঙচুর চালান।
হলুদ রঙের পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি ও সাদা পায়জামা পরা এক ব্যক্তি বড় বাঁশ দিয়ে ডেইলি স্টারের নিচতলার কাচের দরজা বারবার ভাঙেন।
এদিকে, ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ডেইলি স্টার অফিসের সামনে নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবিরকে হেনস্তাকারীর পরনে ছিল নীল পলো শার্ট। তার মাথার চুল বড় ও কোঁকড়ানো ছিল। তিনি নুরুল কবিরের চুল ও জামা ধরে টেনে হেনস্তা করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। রাতের বেলায় অনেক লোক এক সঙ্গে থাকায় শনাক্ত করতে কিছুটা সময় লাগছে। এ ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন, কেউ ছাড় পাবে না। শনাক্তকরণ ও অভিযান—দুটিই চলমান রয়েছে।


