ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো অফিস যেন ধ্বংসস্তূপ। ঘণ্টা কয়েক আগে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে অফিসের বই, জরুরি কাগজপত্র ও নিউজরুমের যন্ত্রপাতি। শোকস্তব্ধ সাংবাদিক ও কর্মীরা একে বর্ণনা করছেন ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হিসেবেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলো ডিজিটালের এক কর্মী টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, এই হামলা তার ব্যক্তিগত জীবনের এক গভীর মুহূর্তের সঙ্গে মিলেছে।
‘প্রথম আলো পত্রিকায় আমার কর্মজীবনের ১১ বছর পূর্ণ হওয়ার দিন ছিল কাল। এমন দিনে কর্মস্থলকে আগুনে পুড়তে দেখার ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করা সম্ভব না।’ অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলেন, ‘এই অফিস আমাদের বাড়ির মতো। আমরা একটা পরিবার। যতটা ক্ষতি হয়েছে, তা কখনোই পূরণ করা যাবে না।’
পুড়ে যাওয়া এবং পানিতে ভিজে যাওয়া বইগুলো ভবনের বাইরে স্তূপ হয়ে পড়েছিল, আর ছিল ভাঙা কাঁচ ও আসবাবপত্র। অগ্নিনির্বাপণ কাজের জন্য ভবনের বাইরের অংশে পানি পড়ছিল, সেখানেই ক্ষতিগ্রস্ত মনিটর, ভাঙা গাছের টব এবং ধ্বংস করা সিসিটিভি ক্যামেরার অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।
রাস্তা থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল এই ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ। হামলায় ভেঙে ফেলা হয়েছে ভবনের শাটার, আর পাশেই পড়ে ছিল নিরাপত্তা স্ক্রিনিং মেশিন। মেঝেতে পোড়া এবং ছেঁড়া দলিলের স্তূপ, তার মধ্যে থেকেও উঁকি দিচ্ছে লিফটের দেয়ালে লেখা ‘সত্যই সাহস’।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা লিফটটি পাশ কাটিয়ে পাশের সিঁড়ি ব্যবহার করে ওপরের তলায় পৌঁছায়, যেখানে তারা ব্যাপকভাবে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ চালায়। নিচতলায় প্রথম আলো প্রকাশনীর নামফলকটিও ভাঙচুর করা হয়। ভবনের ভিতরে কিছু অর্ধপোড়া বই দেখা যায়।

বাইরে, পোড়া এবং পানিতে ভেজা নোটবুকগুলোও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাওয়া যায় এক প্রতিবেদকের নোট। শুক্রবার সকালে ‘ক্রস করবেন না’ ব্যানার নিয়ে ওই এলাকা ঘিরে রেখেছে পুলিশ। তার মধ্যেই কয়েকজন কৌতূহলীকে অফিসে প্রবেশ করতে দেখা যায়।
ওই ভবনেই কাজ করেন চরকি প্ল্যাটফর্মের কর্মীরা। তাদের মতে, এই ক্ষতি শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। এক কর্মী বলেন, ‘আর্থিক ক্ষতিতো হিসাব করা যায়, কিন্তু আমাদের সব আর্কাইভ নষ্ট হয়ে গেছে। তা এক অপূরণীয় ক্ষতি।’ গুরুত্বপূর্ণ সব নথি এবং রেকর্ড সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার কারণে সব কর্মীকে অফিস থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে।’
চরকির আরেক কর্মীর অভিযোগ, প্রথম আলোর প্রতি শত্রুতার কারণে এই হামলা চালানো হয়েছে। ‘আমাদের পুরো অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা ছিল আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি।’
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে অফিস থেকে বের হন প্রথম আলোর আরেক কর্মী, পরে জানতে পারেন ভবনটি আগুনে পুড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘অনেক বাধার মুখে সত্য প্রকাশ করেছে প্রথম আলো, কিন্তু এই হামলায় আক্রমণ আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে।’
হামলায় কেউ শারীরিকভাবে আহত হয়নি কারণ আগুন লাগার পর কর্মীরা দ্রুত ভবন থেকে বের হয়ে যায় তবে মানসিকভাবে অনেক বেশি আঘাত পেয়েছেন কর্মীরা। কর্মীরা জানান, ভবনের প্রথম তলায় ছিল প্রথম আলো প্রকাশনী, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ তলায় ছিল হিসাব বিভাগ, ডিজিটাল মিডিয়া অফিস, চরকি প্ল্যাটফর্ম এবং ক্যান্টিন।

তেজগাঁও থানা পুলিশের কর্মকর্তা কাশাইনিউ মারমা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এখনও কোনো সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার হয়নি।
বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবরে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালায় একদল বিক্ষুব্ধ মানুষ।
হামলাকারীরা ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় তারা প্রথম আলো ও ভারতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেয়।


