প্রথম আলোর অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় তেজগাঁও থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার আট আসামির দুই দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে আদালত।
বৃহস্পতিবার আদালতে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাতের আদালত এই আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
এ সময় রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড চেয়ে শুনানি করেন। অপরদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের জামিন চান। পরে আদালত জামিন নাকচ করে প্রত্যেকের দুই দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।
আসামিরা হলেন মো. নাইম ইসলাম (২৫), মো. সাইদুর রহমান (২৫), আবুল কাশেম (৩৩), মো. প্রান্ত সিকদার (২১), মো. রাজু আহম্মেদ (৩৩), মো. সাগর ইসলাম (৩৭), মো. জাহাঙ্গীর (২৮) ও মো. হাসান (২২)।
বুধবার এ আটজন আসামির সাত দিনের রিমান্ড শুনানি করেন মামলায় নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক ত্রিদীপ বড়ুয়া। রিমান্ড শুনানিতে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মোহাম্মদ তদন্তে সন্তুষ্ট না হওয়ায় একদিন বাড়িয়ে বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।
এ সময় আদালতে নতুন তদন্ত কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আটজন আসামির রিমান্ড চাইলেন, মামলায় কে ছিল, কে নাই, এটার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তো লাগবে। তদন্ত এ রকম হলে কেমনে হবে? রিমান্ড চাইতে তো একটা ন্যূনতম প্রস্তুতি লাগবে।এ মামলায় আপনি নতুন আইও, একটু দেখেন, আরও প্রস্তুতি নিয়ে কালকে আসেন, এভাবে হবে না।’
এর আগে তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন তেজগাঁও থানার পরিদর্শক আবদুল হান্নান। তিনি গত ২৩ ডিসেম্বর ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। পরে ২৮ ডিসেম্বর এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক ত্রিদীপ বড়ুয়া। রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর শামসুদ্দোহা সুমন আসামিদের রিমান্ড চেয়ে শুনানি করেন।
আসামি পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিলপূর্বক জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করেন। গতকাল শুনানিতে আদালতে তারা বলেন, আসামিদের কারও নাম এজাহারে উল্লেখ ছিল না। হাদি হত্যায় আসামিরা শুধুমাত্র পোস্ট দিয়েছে। এটা তো কোনো অপরাধ না। শুধুমাত্র পোস্টের কারণে ধরে নিয়ে এসেছে। পোস্ট দেওয়ার কারণে রিমান্ড চাওয়া হচ্ছে। তারা তাদের সহযোদ্ধার (হাদি) মৃত্যুতে পোস্ট দিয়েছে। আসামিরা সবাই জুলাই যোদ্ধা। প্রথম আলো আওয়ামী লীগের কাজ করেছে। তাদের ওপরে সবার ক্ষোভ আছে। আমাদেরও আছে। পোস্ট করলে তো দোষ হতে পারে না। রিমান্ড চাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। প্রয়োজনে জেলগেট জিগ্যাসাবাদ দেন।
পরে আদালত আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বলেন, ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জুলাই আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা ছিল, যে ওইদিন আগুনে আটকা পড়েছিল! তার ক্ষেত্রে কি বলবেন। এভাবে ঢালাওভাবে কারও বিরুদ্ধে বললে হবে না। দু’ই দিকেই দেখতে হবে। পরে আদালত রিমান্ড শুনানির জন্য আজ ৮ জানুয়ারি ধার্য করেন।
রিমান্ড আবেদন অনুযায়ী, তদন্তকালে এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন ও বিশ্বসন্ত সোর্সদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এই আসামিদেরকে একাধিক যায়গায় অভিযান পরিচালনা করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামি মো. নাইম ইসলাম (২৫) এর কাছে থেকে লুট করা নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং লুণ্ঠিত অর্থ দিয়ে ক্রয়কৃত ১টি ফ্রিজ, ১টি এলইডি টিভি উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে। অন্যান্য আসামিরা এ ঘটনার সময়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটায়।
আবেদনে আরও বলা হয়, মামলায় বাদীর ন্যায় বিচার ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি রক্ষা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য আসামিদের নাম ঠিকানা সংগ্রহ, আসামিদেরকে সনাক্ত পূর্বক গ্রেপ্তার, মদদ দাতা চিহ্নিত করা, লেটের মালামাল, নগদ টাকাসহ অন্যান্য লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের জন্য আসামিদের সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন।
আসামি পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিলপূর্বক জামিনের আবেদন করে, রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেকের দুই দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৮ ডিসেম্বর রাত সোয়া ১১টার দিকে ২০ থেকে ৩০ জন অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা, দাহ্য পদার্থ নিয়ে মিছিল করে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে এসে হামলার চেষ্টা চালায়। পুলিশ বাধা দিলে তারা বেআইনিভাবে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে সমবেত হয়ে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী স্লোগান দেয়। বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তারা লোক জড়ো করে। প্রথম আলোতে হামলার জন্য উসকানিমূলক পোস্ট দিতে থাকে। ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ জন দুষ্কৃতকারী প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়।
আরও বলা হয়, রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে তারা প্রথম আলো কার্যালয়ের ফটকের কাচ ও শাটার ভেঙে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। তারা ভবনের সামনের কাচ ভেঙে আসবাব, মালপত্র, নথিপত্র নিচে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিভিন্ন তলার দেড় শত কম্পিউটার, ল্যাপটপ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, লকারে রাখা টাকা, প্রথমা প্রকাশনের বইপত্র লুট করে নিয়ে যায় দুষ্কৃতকারীরা। তারা ভবনের অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলে। সাক্ষ্য প্রমাণ নষ্ট করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। তারা ফায়ার সার্ভিসকেও আগুন নেভানোর কাজে বাধা দেয়। হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় শুধু লুটপাট করা সম্পদের মূল্য ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩২ কোটি টাকা বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
ওই ঘটনায় প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠানের হেড সিকিউরিটি অফিসার মেজর (অব.) মো. সাজ্জাদুল কবির বাদী হয়ে মামলাটি করেন।


