পুতিন-শি ‘ব্রোমান্স’ সত্ত্বেও আলোর মুখ দেখেনি পাইপলাইন চুক্তি

পুতিন-শি ‘ব্রোমান্স’ সত্ত্বেও আলোর মুখ দেখেনি পাইপলাইন চুক্তি
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

রাশিয়া-চীন বন্ধুত্বের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বেইজিংয়ে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যে দারুণ রসায়ন দেখা গেলেও জ্বালানি খাতের পাইপলাইন চুক্তি এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে মস্কো।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল প্রতীক্ষিত চীন সফরের পরপরই রুশ প্রেসিডেন্টের বেইজিং সফর ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা ছিল তুঙ্গে। মস্কো-বেইজিং শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক পুতিনের এবারের সফরে নতুন মাত্রা পাবে বলে ধারণা করছিলেন বিশ্লেষকরা।

হয়েছেও তাই… পুতিনের সফর ঘিরে বেইজিংকে এক টুকরো মস্কো হিসেবেই সাজিয়েছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু শি জিনপিং।

দুজন যখন লাল গালিচা ধরে চীনের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন দেশটির সামরিক ব্যান্ড দল বাজাচ্ছিল রুশ রোমান্টিক ধ্রুপদি গান ‘মস্কো নাইটস’।

গানের কথায় ছিল- ‘যদি তুমি জানতে, এই মস্কোর রাতগুলো আমার কাছে কত প্রিয়।’

সেই সুরের ভেতরে কি লুকিয়ে ছিল রাজনৈতিক প্রেমের ইঙ্গিত? নাকি এক ধরনের রাজনৈতিক বন্ধুত্বের উষ্ণতা?

মুহূর্তেই সেই ‘ব্রোমান্সের’ খোলাসা করেন পুতিন। শি জিনপিংকে বলেন ‘আমার প্রিয় বন্ধু’। জবাবে শি জিনপিং পুতিনকে বরণের সময় বলেছেন ‘আমার পুরোনো বন্ধু’।

দুই নেতার ভাষাতেই ফুটে উঠল এমন এক সম্পর্কের ছবি, যেটিকে তারা বিশেষ সম্পর্ক ‘ব্রোমান্স’ হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করেন।

বেইজিং সফরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে স্বাগত জানান চীনের প্রেসিডেন্ট শি। ছবি: এপি/ইউএনবি

পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৫ বছরে ৪০ বারেরও বেশি সাক্ষাৎ করেছেন। যৌথ বক্তব্যে তারা বলেন ‘কৌশলগত সহযোগিতা’, ‘অংশীদারত্ব’, ‘পারস্পরিক সম্মান’, ‘বন্ধুত্ব’ ও ‘বিশ্বাসের’ কথা তুলে ধরেন।

একসঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ পারমাণবিক নীতির সমালোচনা করেন। শুধু তাই নয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনারও নিন্দা জানান।

ট্রাম্পকে অনেকটা কটাক্ষ করে পুতিনের সফরের আগের দিন রুশ পত্রিকার প্রথম পাতায় দুটি বড় ছবি প্রকাশ করে। একটিতে দেখা যায়, চীন সফর শেষে এয়ার ফোর্স ওয়ানের সিঁড়ি বেয়ে একা উঠে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য ছবিতে পাশাপাশি হাঁটছেন পুতিন ও শি জিনপিং।

বিশ্বমঞ্চে রাশিয়া ও চীন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে- সেই বার্তাই যেন বিশ্বকে আবার মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

আরও পড়ুন

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্সিয়াল বাগান ঘুরে দেখেন ট্রাম্প। ছবি: এপি/ইউএনবি

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন- এটি প্রেম, রোমান্স বা বন্ধুত্বের জগৎ নয়। এটি ভূরাজনীতির বাস্তবতা।

আর ভূরাজনীতির জগতে পারস্পারিক সম্পর্ক খুব কমই ভালোবাসা বা আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে মূল বিষয় থাকে কেবল ‘স্বার্থ’।

শি-পুতিন বৈঠকেও সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত মিলেছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে।

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া টু’ নামে নতুন গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প এগিয়ে নিতে চাইছে। বেইজিং সফরে এ বিষয়ে অগ্রগতির আশা করেছিল মস্কো।

এই পাইপলাইনের মাধ্যমে পশ্চিম সাইবেরিয়া থেকে মঙ্গোলিয়া হয়ে উত্তর চীনে অতিরিক্ত রুশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজার হারানোর ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবে রাশিয়া।

গত বছর এ প্রকল্প নিয়ে রাশিয়া ও চীন একটি সমঝোতা স্মারকেও সই করেছিল। তবে বেইজিংকে সেই সমঝোতা চুক্তিতে রুপান্তরে এখন আর আগ্রহী মনে হচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত জটিলতার পাশাপাশি চীন রুশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে চায় না।

গত বুধবার ক্রেমলিন জানিয়েছিল, প্রকল্পটির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে রাশিয়া ও চীন ‘সাধারণ সমঝোতায়’ পৌঁছেছে।

তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো চুক্তির লক্ষণ নেই। এতে রুশ কর্মকর্তারা হতাশ হলেও বিস্মিত নন।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: এপি/ইউএনবি

রুশ সরকার বলছে, রাশিয়া ও চীনের অবস্থান এক নয়। তাদের স্বার্থও সবসময় এক জায়গায় মেলে না।

পুতিন ও শি জিনপিংয়ের পাশাপাশি হেঁটে যাওয়ার ছবি প্রকাশ করা রুশ পত্রিকাও পুতিনের সফর শেষে সুর পাল্টে লিখেছে, ‘এত বড় দুটি দেশ, উভয়ের মধ্যেই “মহাশক্তি” অর্জনের মানসিকতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নিজ স্বার্থে ছাড় দিয়ে এর ভিন্ন কিছু হওয়ার সুযোগ নেই।’

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দেন- কয়েক মাস আগে ট্রাম্পের সঙ্গেও এমন ‘রাজনৈতিক বন্ধুত্বের’ উপমা সৃষ্টি করেছিলেন পুতিন। দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়েই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এপি/ইউএনবি

তার আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় ঐতিহাসিক বৈঠক করেন দুই প্রেসিডেন্ট। রুশ কর্মকর্তারা এরপর থেকে ‘দ্য স্পিরিট অব অ্যাঙ্করেজ’ বলে একটি নতুন প্রবাদ ব্যবহার শুরু করেন। যার অর্থ দাঁড়ায়, ইউক্রেন যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায়, সে বিষয়ে মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে এবং সেটি রাশিয়ার গ্রহণযোগ্য শর্তেই।

কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হয়নি। হারিয়ে গেছে দ্য স্পিরিট অব অ্যাঙ্করেজও।

সেই সুযোগে আরও মজবুত হয়েছে মস্কো-বেইজিং কূটনীতি।

শি-পুতিন বৈঠকের ফাঁকে রুশ প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সহকারী ইউরি উশাকভ বলেন, ‘মস্কোর কাছে বেইজিংয়ের চেতনা এখনো টিকে আছে। এটি হারাবার নয়।’

 

সূত্র: বিবিসি

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad