জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের—এমন একটি কল রেকর্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন।
রোববার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম কল রেকর্ডটি উপস্থাপন করে বলেন, এটি মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক প্রমাণ।
প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত কথোপকথনে ওবায়দুল কাদেরকে পলকের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘নেটটা একটু স্লো করে দাও।’ জবাবে পলক বলেন, ‘একটু নেত্রীর পারমিশনটা নিয়ে নিই?’ তখন কাদের বলেন, ‘নিয়ে নাও।’
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের একটি ফোনালাপ দাখিল করা হয়। কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের মারার জন্য উৎসাহিত করেন কাদের।
শুনানিতে প্রসিকিউটর তামিম বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। হাসিনার আমলে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনকল নজরদারি ও রেকর্ড করা হতো।
যুক্তিতর্কে গণঅভ্যুত্থান দমনে কোথায় কী ধরনের বৈঠক ও যোগাযোগ হয়েছিল, সেসবের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রসিকিউটর তামিম। তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের ও জুনাইদ আহমেদ পলকের কলরেকর্ড একটি দালিলিক প্রমাণ। এই কথোপকথনে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। পরে শেখ হাসিনার অনুমোদন নিয়ে তা কার্যকর করেন পলক।
বিষয়টি শুধু কথোপকথনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না উল্লেখ করে তামিম বলেন, ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রি-জি ও ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশনা জারি করেছিল সরকার। শুধু তাই নয়, আন্দোলন চলাকালে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ বেশ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি সিস্টেম ক্রাইমের একটি অংশ। এ ছাড়া জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া আহত আন্দোলনকারীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
প্রসিকিউশনের দাবি, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের কথোপকথনের পরপরই ১৬ জুলাই ওয়াসিমসহ তিনজনকে আওয়ামী লীগের নেতারা গুলি চালিয়ে হত্যা করেন। এছাড়া ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনেও আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে ট্যাগ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তাদের কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী, জঙ্গি, বিএনপি-জামায়াত ও রিলিজিয়াস অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি উঠে এসেছে। হাছান মাহমুদ বলেছিলেন, আন্তর্জাতিকভাবে ‘জঙ্গি’ শব্দটি গুরুত্ব পায়। তাই এ শব্দ ব্যবহার করা হলে আন্তর্জাতিক বিশ্ব আমাদের পক্ষে কথা বলবে।
এ সময় শেখ হাসিনার একটি কথোপকথনের উদ্ধৃতি তুলে ধরে তামিম বলেন, ‘ওরা তো আমাদের অনেক কিছু পোড়াইছে। ওদের বাড়িঘর সব পোড়ায় দে। ওদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে না? সেগুলো পোড়ায় দে। এখন শুধু একটাই কাজ, সময়মতো বসে থাকবা, আর ওদের ঘরবাড়িতে আগুন দিবা।’
প্রসিকিউটর তামিম সাংবাদিকদের বলেন, শেখ হাসিনার সময়ে চালু করা বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে একটি ছিল ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)। এর প্রধান ছিলেন জিয়াউল আহসান। তার মাধ্যমে তিনি ফোন কলগুলোকে রেকর্ড করতেন। শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই নিজের ফোনকল এনটিএমসিতে দেননি। কিন্তু আমরা অসংখ্য ফোনকল পেয়েছি এ সংস্থার মাধ্যমে। শেখ হাসিনা ঠিক যার সঙ্গে কথা বলছেন, তার ফোন নম্বরটি এনটিএমসিতে ছিল। এ কারণে ওই ব্যক্তির সঙ্গে যে-ই কথা বলতেন, সেটি রেকর্ড হয়ে যেত। একইভাবে শেখ হাসিনাও যখন এসব ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছেন, তখন তার ফোনকলও রেকর্ড হয়েছে।
এমন বহু কল রেকর্ড থেকে দেখা গেছে, নিজেদের অধীনস্থদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে প্রাণঘাতী অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মী। এছাড়া ওবায়দুল কাদের তার একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলছেন যে, কীভাবে সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের টাকা দিয়ে আন্দোলনে প্রতিহত করতে হবে। আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ করতে হবে। সেই টাকা কোন উৎস থেকে আসবে, কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, এমন একটি কথোপকথনও আমরা দেখিয়েছি।


