জন্মের পরপরই অনেকে তাকে মেরে ফেলতে বলেছিলেন। দুই হাত ছাড়া জন্ম নেওয়া শিশু বেঁচে থাকবে, তা ছিল গ্রামের মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য। ১৯৯৫ সালে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়া বাজার গ্রামে জন্ম নেওয়া ওই আয়েশা আকতার আজ অনন্য এক দৃষ্টান্ত। মায়ের মমতায় বড় হওয়া হাতবিহীন আয়েশা পা দিয়ে লিখেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স পাস করেছেন।
তবে আয়েশার পথচলা সহজ ছিল না। পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পর বাবা তাকে সার্কাস দলের কাছে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন। মায়ের আঁচল আঁকড়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান আয়েশা। আয়ত্ত করেন পা দিয়ে সব কাজ করার কৌশল। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ও ২০২৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো চাকরি জোটেনি তার। আয়েশার সংগ্রামী জীবন নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। এলাকার মানুষের কাছে তিনি এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক। অথচ তার নিজের জীবন কাটছে চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তায়।
আয়েশা আকতার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘কোনোদিন দুই বেলা, কোনোদিন এক বেলা খেয়ে বেঁচে থাকি। কী কষ্টে দিন কাটে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এই পর্যায়ে এসে মনে হচ্ছে, জন্মের পরপরই মারা গেলে ভালো হতো। এই বোঝা টানতে হতো না।’

চাকরির কঠিন বাজার নিয়ে আয়েশা বলেন, ‘যাদের হাত আছে, তারাই পরীক্ষায় টিকতে পারছে না। আমার জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। বিশেষ বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী একটা সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাকি জীবন মায়ের সঙ্গে থাকতে পারতাম।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘মায়ের বয়স হয়ে গেছে। আমাদের কোনো সহায়-সম্বল নেই। আমি কিছু না করলে দুজনের বাকি জীবন কীভাবে চলবে!’
আয়েশার বাবা আব্দুল লতিফ দেড় বছর আগে মারা গেছেন। তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন বৃদ্ধ মা শাজেদা বেগমের সঙ্গে থাকেন আয়েশা। পায়ের আঙুল দিয়ে বটি ধরে তরকারি কাটা, কুলায় চাল ঝাড়া, রান্না ও গোসলসহ সংসারের সব কাজই তিনি একাই করেন।
আয়েশার মা শাজেদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘অনেকে বলেছিল মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। আমি কখনো তাকে অভিশাপ মনে করিনি। ও পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স শেষ করেছে। আমি শুধু চাই, আমার মেয়েটা যেন যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরি পায়।’
সাঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট আয়েশার লড়াইয়ের প্রশংসা করে বলেন, তার পাশে সমাজের সবার দাঁড়ানো উচিত।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর জানান, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। আয়েশার কর্মসংস্থান ও সরকারি সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
তবে এই আশ্বাস আয়েশা দীর্ঘদিন ধরে শুনছেন। বাস্তবে কোনো সুরাহা হয়নি। দিন দিন তার সংগ্রামী জীবনের দীর্ঘশ্বাস কেবল ভারী হচ্ছে। অসহায় এই মা-মেয়ের দিকে সরকারের সহানুভূতির সুদৃষ্টি পড়বে কি না, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।


