জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ‘আদিবাসী ঐক্য জোট’ নামে নতুন একটি জোট আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত অন্তত ৩০টি অঞ্চলে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এই জোট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সদ্য পদত্যাগ করা গারো জনগোষ্ঠীর নেতা অলিক মৃরের উদ্যোগ নতুন এই জোট গঠন হতে যাচ্ছে।
পাহাড় থেকে সমতলে এ জোটের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মার্কা হতে পারে ‘প্রজাপতি’। আর সব আসনেই তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার চেষ্টা থাকবে।
প্রবীন বামপন্থী নেতা বিমল বিশ্বাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ‘আদিবাসী ঐক্য জোটের’ ভোট করার উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে এক পাহাড়ি স্কুলছাত্রী ধর্ষণ ও তার বিচারের দাবিতে সংঘটিত আন্দোলন নিয়ে ‘নীরবতা’ ও ‘মিথ্যাচারের’ অভিযোগে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন অলিক। তারপরই ‘আদিবাসী ঐক্য জোটের’ ব্যানারে স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে দেশজুড়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের এই উদ্যোগ নেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ মানুষের ভোট আওয়ামী লীগের বাক্সে যায়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে এই ‘ন্যারেটিভ’ দাঁড় করানো হয়েছে যে, কেবল তারাই এসব সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর মানুষের ভরসা।
কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র জাতিগুলোর নেতারা নিজেরাই সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই চেষ্টারই ফলাফল ‘আদিবাসী ঐক্য জোট’।
দ্রুতই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করবেন বলে জানিয়েছে নতুন জোটের নেতারা। ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আঞ্চলিক দল ও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রস্তুতিপর্ব চলছে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে অলিক মৃ বলেন, ‘আদিবাসী ঐক্য জোটের ব্যানারে এবার আমরা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেব। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে সমতলের যেখানে যেখানে আদিবাসীরা সংখ্যায় বেশি, সেখানেই প্রার্থী দেওয়া হবে।
এ জোটের নির্বাচনী মার্কা ‘প্রজাপতি’ চেয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করবেন বলে তিনি জানান।

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও জাতীয় আদিবাসী পরিষদ—আদিবাসীদের এই তিনটি প্রধান দল ও সংগঠনের সঙ্গে লিয়াজোঁ গড়ে আমরা প্রার্থী দেব। নতুন আদিবাসী নেতৃত্বকে নির্বাচিত করাই আমাদের লক্ষ্য,’ বলেন তিনি।
অলিক নিজে টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর ও ধনবাড়ী) আসনে লড়বেন বলে জানালেন। এ এলাকায় তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
এ প্রসঙ্গে বিমল বিশ্বাস বলেন, ‘অধিকার আদায়ে আদিবাসীরা এবার নিজেরাই প্রার্থী হবেন, এটি খুবই ইতিবাচক দিক। বরাবরই শাসকগোষ্ঠী তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ছাড়াও সীমাহীন নিপীড়ন করেছে। এ কারণে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন জানাই।’
বড় দলের বাইরে গিয়ে জোট করে কতটুকু প্রভাব সৃষ্টি করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তবে, যেহেতু এই জোট ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত বিশেষ কিছু অঞ্চলে প্রার্থী দেবে তাই তাদের ক্ষেত্রে পাস-ফেলের চেয়ে শক্তি সঞ্চয়ের বিষয়টি সামনে আসতে পারে, যা তাদের জন্যে পরবর্তীতে কাজে লাগবে বলে মনে করেন তিনি।
সূত্রগুলো বলছে, সাবেক গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বধীন জাতীয় আদিবাসী ফোরামের রয়েছে দেশজুড়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব নেটওয়ার্ক।

‘আদিবাসী ঐক্য জোট একটি সুসংগঠিত উদ্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, আর এ কারণেই এই উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘অলিক মৃ আদর্শিক ও পরিশ্রমী সংগঠক। তার এই নতুন এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। এই উদ্যোগে এবার নির্বাচনে আদিবাসীরা কোনো নির্দিষ্ট দল বা প্রতীকে ভোট দেবে না। বরং আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে নিজস্ব তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার চেষ্টা করবে। তারাই হবে আদিবাসীদের প্রাণশক্তি।’
‘যেখানে আমরা আদিবাসীর স্বতন্ত্র প্রার্থী দিতে পারব না, সেখানে আমরা ভেবে-চিন্তে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করব,’ বলেন সঞ্জিব দ্রং।
তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সমর্থনের কারণে বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস) দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। প্রায় আট বছর পর বাগাছাস আবারও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। যা ‘আদিবাসী ঐক্য জোটকে’ নতুন শক্তি জোগাবে।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘আদিবাসী ঐক্য জোটের’ সফলতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন একজন পার্বত্য বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ-বিধ্বস্ত জটিল পার্বত্য রাজনীতিতে ভোটের হিসাব-নিকাশ আলাদা।’ পার্বত্য রাজনীতির ‘এখতিয়ার’ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য শান্তিচুক্তি সইয়ের পর গত দেড় দশকে খাগড়াছড়িতে দুই বার ছাড়া বরাবরই আওয়ামী লীগ প্রার্থী কল্পরঞ্জন চাকমা (১৯৯১ ও ১৯৯৬), যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা (২০০৮) ও কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা (২০১৪) নির্বাচিত হন। তবে এর মধ্যে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী ওয়াদুদ ভূঁইয়া।
রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দীপংকর তালুকদার ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে তিনবার নির্বাচিত হন। এ আসনে ১৯৯৬ সালে বিএনপি প্রার্থী পারিজাত কুসুম চাকমা ও ২০০১ সালে মনি স্বপন দেওয়ান এবং ২০১৪ সালে জনসংহতি সমিতি নেতা, স্বতন্ত্র প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার জয়ী হন।
বান্দরবানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বীর বাহাদুর জয় পান ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে তবে ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি প্রার্থী সাচিং প্রু জেরী।
অন্যদিকে, সমতলে ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে ২০০১, ২০০৯ ও ২০১৪ সালে জয়ী হন গারো জনগোষ্ঠীর নেতা প্রমোদ মানকিন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন।
এছাড়া রাজশাহী-২ (রাজপাড়া ও বোয়ালিয়া) আসনে সাঁওতাল-উঁরাও-মুণ্ডা জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলে ফজলে হোসেন বাদশা (২০০৮) ওয়ার্কার্স পার্টি ও মহাজোটের সমর্থনে এবং ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন।


