সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আলাদা মামলায় মেজর মো. সাদিকুল হক ও তার স্ত্রী সুমাইয়া তাহমিদ জাফরিনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
সোমবার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সহকারি পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গেরিলা প্রশিক্ষণের ঘটনায় মেজর সাদেককে ভাটারা থানার ও তার স্ত্রী জাফরিনকে গুলশান থানার মামলায় সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাৎ রিমান্ডের আদেশ দেন।
মেজর সাদিককে প্রথমে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পরে রিমান্ডের শুনানি হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আল আমিন আদালতে তার দুই মক্কেলের জামিন চেয়ে শুনানি করেন। পরে আদালত জামিন নাকচ করে তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের গুলশান বিভাগের ইন্সপেক্টর মো. জেহাদ হোসেন গত ১৫ ডিসেম্বর মেজর সাদিককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। এরপর আদালত গত ২৪ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করেন।
তবে, ওইদিন সাদিককে আদালতে হাজির না করায় শুনানি হয়নি। ওইদিনই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাদিকের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। আদালত গ্রেপ্তার এবং রিমান্ড বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করেন সোমবার।
এর আগে, গত ২১ ডিসেম্বর জাফরিনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন ডিবি পুলশের গুলশান জোনাল টিমের ইন্সপেক্টর মোজাম্মেল হক মামুন। আদালত রিমান্ড বিষয়ে শুনানির দিন সোমবার ধার্য করেন। এদিন শুনানির সময় তাদের আদালতে হাজির করা হয়।
মেজর সাদিকের রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘সামরিক আদালত থেকে গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে চাকুরিচ্যুত করে মেজর সাদিককে। এরপর তাকে তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়ে ঢাকা কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি এ মামলার জড়িত প্রধান সন্দেহভাজন আসামি।’
তিনি আরও জানান, সেনাবাহিনীতে চাকরি করা অবস্থায় গত ৩ জুলাই এবং ৮ জুলাই সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দিনব্যাপী ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সংলগ্ন কেবি কনভেনশন হলের ভেতর নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সঙ্গে একত্রিত হয়ে একটি গোপন সভা করেন। তাদের কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও সমর্থকদের উৎসাহিত এবং দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি বিষয়ক আলোচনা এবং প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়েছিল।
মেজর সাদিক প্রধান প্রশিক্ষক এবং কানেক্টরের ভূমিকায় থেকে রুপগঞ্জে নিজের বাসায় স্ত্রীসহ একাধিকবার গোপন প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন বলেও অভিযোগ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
আবেদনে আরও বলা হয়, ‘মেজর সাদিক অপারেশন ঢাকা ব্লকেড’র কানেক্টরের ভূমিকায় ছিলেন। এ আসামি ওই সংগঠনের মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন নেতাকর্মীদের সংগ্রহ করে ডাটা এন্ট্রি, বিভিন্ন গোপন কোড তৈরিতে সহায়তা করে। তিনি অন্যান্য আসামিদের গোপন কোড এবং ওই কোডের অনুকূলে ছদ্মনাম প্রদানসহ অনলাইন সিগন্যাল অ্যাপ ও হোয়াটসঅ্যাপ এবং গুগলের মাধ্যমে ওই সংগঠনকে একত্রিত করার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
কেবি কনভেনশন হলে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়। তিনি গত ৩, ৮ জুলাই কার্যক্রম স্থগিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তিন থেকে চারশ নেতাকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেন এবং অনুষ্ঠানে প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার কয়েকজন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন।’ গ্রুপের মাস্টারমাইন্ডদের সনাক্ত, ঘটনার সাথে জড়িতদের বিদেশে অবস্থান এবং ষড়যন্ত্রকারীদের সনাক্তসহ ৮ কারণ দেখিয়ে তার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থনা করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
সুমাইয়া তাহমিদ জাফরিনের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ‘এ মামলার গ্রেপ্তারকৃত সুমাইয়া তাহমিদ জাফরিন এ ঘটনায় মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের দেশের সার্বভৌমত্ত্ব ও দেশের মানুষের নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানো ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াসে একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের অর্থযোগানদাতা, পরামর্শদাতা ও নির্দেশদাতা হিসেবে সক্রিয়ভাবে দেশ বিরোধী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করে। আসামি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সক্রিয় সদস্য বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়। তিনি ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় সরকার ও রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপের সাথে জড়িত সদস্যদের অর্থ যোগান দিয়ে থাকেন বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়াও আসামি ঘনিষ্ঠ লোকজন যারা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের প্রভাবশালী নেতাকর্মী তাদের সাথে আসামির নিয়মিত যোগাযোগ আছে বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে, মামলার সাথে জড়িত ষড়যন্ত্রকারী ও অর্থ যোগানের উৎস খুঁজে পাওয়াসহ সাত কারণে তার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন করেন তদন্তকর্তারা।
মেজর সাদিকের সন্ত্রাসবিরোধী মামলার বিবরণীতে বলা হয়, গত ৮ জুলাই বসুন্ধরা সংলগ্ন কে বি কনভেনশন সেন্টারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ একটি গোপন বৈঠকের আয়োজন করে। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা মিলে তিন থেকে চারশ জন অংশ নেন। তারা সেখানে সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। বৈঠকে পরিকল্পনা করা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পাওয়ার পর সারা দেশ থেকে লোকজন এসে ঢাকায় সমবেত হবেন। তারা ঢাকার শাহবাগ মোড় দখল করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দেশে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করবেন।
এ ঘটনায় ১৩ জুলাই ভাটারা থানার এসআই জ্যোতির্ময় মন্ডল সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলাটি দায়ের করেন।
অপরদিকে, সুমাইয়া তাহমিদ জাফরিনের মামলার বিবরণীতে বলা হয়, গত ২২ এপ্রিল সকালে গুলশান-১ এর জব্বার টাওয়ারের পাশে ৩০ থেকে ৩৫ জন সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল করে। আসামিরা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দেশবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়।
পুলিশ সেখানে গিয়ে কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় পুলিশ ওইদিনই গুলশান থানায় মামলা করে।


