পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের গঠিত তিনটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। কমিটিগুলো হলো পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও পরামর্শক কমিটি।
রোববার জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার বিভাগের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়। এতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে সরকার একতরফাভাবে এসব কমিটি গঠন করেছে। এতে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি বিষয়ক অধিশাখার অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবিরের স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ গেজেটে তিন কমিটি গঠনের বিষয়টি প্রকাশ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৯ সদস্যের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে অর্থ ও পরিকল্পনা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, ভূমি, আইন, বিচার ও সংসদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা রয়েছেন। তিন পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারাও কমিটিতে রয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, এনএসআই, ডিজিএফআই, বিজিবি, আনসার-ভিডিপির মহাপরিচালক, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারসহ সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা রয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাহী কমিটির অন্যতম দায়িত্ব পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন। এর মধ্যে সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জীবনমান উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রচলিত আইন, চুক্তির শর্ত ও বিধি-বিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংস্কার এবং নতুন আইন ও বিধি প্রণয়নের সুপারিশ করার দায়িত্বও এই কমিটিকে দেওয়া হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে নয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের রাখা হয়েছে। কমিটিকে উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে দুই মাসের মধ্যে নির্বাহী কমিটির কাছে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।
জনসংহতি সমিতির অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা না নিয়ে নির্বাহী কমিটির কার্যপরিধিতে সন্ত্রাস, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে কর্মকৌশল প্রণয়নের বিষয়টি রাখা হয়েছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে না দেখে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। এতে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তিন কমিটিতে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ও নির্বাহী কমিটিতে এসব সংস্থার কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিধান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জনসংহতি সমিতির দাবি, আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকায় রাখা হয়নি। চুক্তির স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির ভূমিকাও উপেক্ষা করা হয়েছে। তিন সার্কেল চিফকেও কমিটিগুলোতে রাখা হয়নি।
বিবৃতিতে বিএনপি সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপেরও সমালোচনা করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী করা হয়। একই দিনে চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়। পরে ১ জুন দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২১ আগস্ট বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী করা হয়। ২৭ আগস্ট কক্সবাজার জেলার প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়নসহ সরকারি কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হলেও তিন পার্বত্য জেলার দায়িত্ব প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিনের ওপর রাখা হয়েছে।
জনসংহতি সমিতি আরও বলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী অঞ্চলটির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ার কথা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের। কিন্তু বর্তমান সরকার পরিষদকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়নি। বন্যার সময় তিন পার্বত্য জেলার ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বও আঞ্চলিক পরিষদকে না দিয়ে অন্য একজন প্রতিমন্ত্রীর ওপর দেওয়া হয়েছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বিএনপি সরকারের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির ১৩টি আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছিল। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পরও চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এ অবস্থায় জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক কমিটি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি, শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্স, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং এ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পদ সংরক্ষণ না করারও দাবি জানিয়েছে।


