পারস্য উপসাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এবার পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও ইরানের বন্দরে চলমান নৌ অবরোধের মধ্যেই এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সোমবার দুই দেশের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টি ফের হুমকির মধ্যে পড়েছে।
এই নতুন হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রণালিতে আটকে পড়া তেলবাহী জাহাজ ও অন্য নৌযানকে নিরাপদে পার করে দেওয়ার জন্য মিত্র দেশগুলোকে জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে তারা ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত ইরানের নৌবহরে ফের হামলা চালানোর নির্দেশ দেন তিনি।
সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন। অবশ্য এই প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের আইনি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার দুই দিন পর প্রকাশ করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চলমান থাকায় এবং তা ‘যুদ্ধ শেষের’ প্রমাণ দেওয়ায় এই প্রকল্পে কংগ্রেসের অনুমোদনের বিষয়টি আর প্রযোজ্য নয়।
সোমবার দিনের শেষদিকে উপসাগরে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের খবর জানায় স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, তারা ইরানের ছয়টি ছোট সামরিক নৌকা ধ্বংস করেছে। জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সম্বলিত ফুজাইরাহ তেলবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ওই হামলায় তেলবন্দরের বেশিভাগ স্থাপনা আগুনে পুড়ে যায় বলে দাবি তেহরানের।
গত মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে এটিই প্রথম সামরিক শক্তির প্রয়োগ।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া এ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। এদিকে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচলের বিমা খরচও ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্য অবরোধ করে রেখেছে, যা ইরান প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ শুরুতেই উল্টো ফল দিতে পারে বলে। প্রণালিতে হামলায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল তো বাড়েইনি, বরং ইরানের পক্ষ থেকে আরও শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বড় শিপিং কোম্পানিগুলোও জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি দিয়ে তারা কোনো জাহাজ পাঠাবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘সোমবারের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে এ সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। এরপরও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা এগোচ্ছে।’
সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম আসলে প্রজেক্ট ডেডলক।’ সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সতর্ক করে তিনি বলেন, তারা যেন ‘অশুভ শক্তির ফাঁদে পড়ে জটিল পরিস্থিতিতে না জড়ায়’।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তাদের নৌবাহিনীর সহায়তায় দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে প্রণালী পার হয়েছে। তবে কবে সেগুলো পাড় হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি পেন্টাগন।
অন্যদিকে ইরান এ দাবি অস্বীকার করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর ইরানের ছয়টি ছোট নৌকা ধ্বংসের দাবিও তেহরান অস্বীকার করেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা প্রণালির বাইরেও বিস্তৃত একটি সামুদ্রিক এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলের বড় অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত।
আমিরাত সরকার তাদের তেলবন্দরে হামলাকে যুদ্ধের ‘উস্কানি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বড় ধরনের উত্তেজনার কারণ বলে উল্লেখ করেছে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় তারা আমিরাতে ওই হামলা চালিয়েছে। কারণ ইরানের বন্দরে নৌ অবরোধ চলাকালে বন্দরটি হরমুজ প্রণালির বাইরে থাকায় এটি বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করছিল মার্কিন মিত্ররা।


