রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই প্রদর্শনীতে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ ব্যানার সরানো নিয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। সোমবার রাত ৯টা থেকে ১টা পর্যন্ত কয়েক দফায় এই সংঘর্ষ চলে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন এবং এ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবির স্বাধীনতার স্মারক চত্বরে জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ওই আয়োজনে বিএনপি নেতা সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ডকে জুডিশিয়াল কিলিং দাবি করে প্রদর্শনীতে একটি ব্যানার দেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল সভাপতি ইয়ামিন এবং সাধারণ সম্পাদক ওহীর রায়হানের নেতৃত্বে রাত ৯টার দিকে ছাত্রদল প্রদর্শনীর জায়গায় গিয়ে ওই ব্যানার সরিয়ে ফেলতে পাঁচ মিনিট সময় বেধে দেয়। শিবির সেটি সরাতে অপারগতা জানায়। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় এবং উভয়পক্ষে সংঘর্ষ বাধে।
এ সময় শিবিরের কর্মীরা ছাত্রদলের কর্মীদের ধাওয়া দিলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বাইরে সড়কে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রদর্শনী স্থলের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এরপর শিবিরের ধাওয়া খেয়ে ছাত্রদল সভাপতি ও সেক্রেটারির নেতৃত্বে কিছু নেতাকর্মী বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এবং অন্যান্যরা প্রধান গেট দিয়ে পার্কের মোড়ে গিয়ে অবস্থান নেয়। এ সময় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা প্রধান গেটে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে।

এর কিছু সময় পর ছাত্রদল সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে আবারো প্রধান ফটকের দিকে আসতে চাইলে পুনরায় সংঘর্ষ বাধে এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।
রাত সাড়ে দশটায় ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এম শওকত আলী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়িতে থাকা অবরুদ্ধ ছাত্রদল সভাপতিসহ অন্যান্যদের উদ্ধার করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল ও শিবিরের অল্পবয়সী নেতারা ছাড়াও শহরের বেশ কিছু সিনিয়র নেতাকর্মীকে নিয়ে সিন্ডিকেট বই রুমে যান। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়।সমঝোতা বৈঠক শেষে প্রধান ফটকের সামনে এসে তাদের ব্রিফিং দেওয়ার কথা ছিল।
এরই মধ্যে আবারও পার্কের মোড় থেকে সংঘবদ্ধ হয়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা প্রধান ফটকের অবস্থানরত ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেয়। এতে আবারো শুরু হয় সংঘর্ষ। ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিলে তারা আবারও পিছু হটে কামারের মোড়ের দিকে যায়।
রাত পৌনে ১টায় মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে গোয়েন্দা বাহিনী এবং পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। এরপর ভিসির মধ্যস্থতায় ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের নেতারা সমঝোতার মাধ্যমে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
এর আগে, এই সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর ফেরদৌস রহমান, শিবিরের সাবেক সভাপতি সোহেল রানাসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি রাকিব মুরাদ জানান, ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই কর্মসূচিতে আমরা কিছু নেতাদের ছবি দেই। কিন্তু ছাত্রদলের নেতারা এসে প্রদর্শনী থেকে ওই ব্যানার সরিয়ে ফেলতে বলে। আমরা তখন বলি, এটা প্রশাসন দেখবে। ততক্ষণে প্রদর্শনী সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় আমরা প্রক্টর স্যারকে বলি, এক্ষুনি সরিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু এরই মধ্যে ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মাসুদের নেতৃত্বে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিবির নেতাদের দিকে চেয়ার ছুড়ে দেয়। এতে ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সোহেল রানাসহ অনেকেই আহত হন। পরে এ নিয়ে দফাই দফায় সংঘর্ষ হয়।
রাকিব মুরাদের অভিযোগ, শিবিরের নেতাকর্মীদের উপর হকিস্টিকসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় এবং প্রদর্শনী পণ্ড করে দেওয়ার চেষ্টা করে। তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করে। পরে ছাত্রদল মহানগর এবং স্টেশন থেকে টোকাই ভাড়া করে এনে আবারো প্রধান ফটকে অবস্থান নেওয়া ছাত্রশিবিরের নেতাদের উপর হামলা চালায়। এরপর ছাত্র শিবিরের নেতারা তাদের পাল্টা ধাওয়া দেয়। রাকিব মুরাদ তাদের ১৫ নেতাকর্মী আহত হওয়ার দাবি করেছেন।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়ামিন জানান, প্রদর্শনী থেকে যুদ্ধাপরাধীদের ছবি নামাতে বলায় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। তারা লাঠিদ-সোটা, অস্ত্র নিয়ে নিরস্ত্র ছাত্রদল নেতাদের উপর হামলে পড়ে। এতে তাদের পাঁচজন আহত হয়েছেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘মূলত আমাকে না বলেই ছাত্রদল সেখানে গিয়ে জুডিশিয়াল কিলিং-এর ব্যানারটি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। এতে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে ছাত্রদল উত্তপ্ত হয়। এ সময় উভয় পক্ষই দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আমিও ইটের আঘাতে আহত হই।’
প্রক্টর বলেন, ‘ভিসি স্যারের মধ্যস্থতায় উভয় দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে সিন্ডিকেট রুমে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। উভয় দলই তাদের নেতাকর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিষয়টি সিন্ডিকেট রুম থেকে প্রধান ফটকের সামনে এসে ব্রিফ করার আগেই আবারও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এক পর্যায়ে রাত সোয়া ১টার দিকে উভয়পক্ষকে বুঝিয়ে ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা এই বিষয়টি নিয়ে আবারো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবেন ও এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হবেন না বলে প্রশাসনকে জানান। তখন থেকে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।’

রংপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমরা মূলত প্রশাসন এবং উভয় দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে কোনো ধরনের বল প্রয়োগ ছাড়াই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এম শওকত আলী জানান, উভয়দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠকের পর পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করে দেওয়া হয়েছে।
ভিসি আরো জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে শহীদ আবু সাঈদ চত্বরে মহানগর ছাত্রদল এবং মহানগর ছাত্রশিবির সমাবেশের ঘোষণা দেওয়ায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় ১৪৪ ধারা জারি করার জন্য বেলা সাড়ে ১২টায় মহানগর পুলিশের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।


