পাথরঘাটায় প্রজন্মান্তরের সুরে বয়ে চলা পরম্পরা

পাথরঘাটায় প্রজন্মান্তরের সুরে বয়ে চলা পরম্পরা
বাদ্যযন্ত্র তৈরির দোকানে কর্মরত একজন। ছবি: জাকির হোসেইন/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

চট্টগ্রাম নগরের পাথরঘাটার সঙ্গে সংস্কৃতি, লোকসংগীত আর ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সম্পর্ক বহু পুরোনো। এই এলাকার অলিগলিতে আজও ছড়িয়ে আছে সেই ঐতিহ্যের নানা চিহ্ন। বিশেষ করে সতিশ বাবু লেন ও কালীবাড়ি ঘিরে বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতের একটি ঐতিহ্যবাহী পুরোনো কারিগরি কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

এখানকার কারিগরেরা তবলা, ঢোল, ঢাক, খোল ও ধামসাসহ বিভিন্ন চামড়ার বাদ্যযন্ত্র তৈরি করার পাশাপাশি পুরোনো বাদ্যযন্ত্র মেরামতের কাজও করেন।

ছবি: জাকির হোসেইন/ টাইমস

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, পাথরঘাটায় চামড়ার বাদ্যযন্ত্র তৈরির এই ব্যবসার ইতিহাস প্রায় একশ বছরের পুরোনো। ব্রিটিশ আমল ও দেশভাগেরও আগে থেকে কয়েকটি পরিবার বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাদ্যযন্ত্র তৈরির এই সূক্ষ্ম কারিগরি জ্ঞান তাদের হাত ধরেই টিকে আছে। অনেক কারিগর তাদের বাবা কিংবা দাদার কাছ থেকেই এই কাজ শিখেছেন। কেউ কেউ চার থেকে পাঁচ দশক ধরে নিজের হাতে তবলা, ঢোল কিংবা খোল তৈরি ও মেরামত করে আসছেন। ফলে এটি তাদের কাছে কেবল জীবিকার পথ নয়, বরং পরিবারের উত্তরাধিকার, পরিচয় ও গর্বেরও অংশ।

পাথরঘাটার কারিগররা বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে প্রধানত কাঠ, চামড়া ও লোহা ব্যবহার করেন। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো তৈরি করা হয় শিমুল, আম, বাবলা কিংবা কড়ই কাঠ দিয়ে। এরপর বিশেষ পদ্ধতিতে এর ওপর চামড়া বসিয়ে তৈরি করা হয় বাদ্যযন্ত্রের মূল কাঠামো। তবলার ক্ষেত্রে রয়েছে আরও সূক্ষ্ম কাজ—চামড়া দিয়ে পুড়ি বা ছাতি তৈরি করা, গাব দিয়ে সিহাই বা কালো অংশ বসানো এবং দড়ি কিংবা চামড়ার ফিতা দিয়ে টান ঠিক করা।

তবলা তৈরির কাজ আরও সূক্ষ্ম। চামড়া দিয়ে পুড়ি বা ছাতি তৈরি করতে হয়, গাব দিয়ে বসাতে হয় সিহাই বা কালো অংশ। এরপর দড়ি কিংবা চামড়ার ফিতার সাহায্যে টান ঠিক করতে হয়। সামান্য ভুলও একটি বাদ্যযন্ত্রের স্বর ও ছন্দ বদলে দিতে পারে । তাই এটি তৈরির প্রতিটি ধাপেই হাতের কাজ অত্যন্ত নিখুঁত হওয়া চাই। এর সঙ্গে এই বাদ্যযন্ত্র তৈরির  দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকাও বেশ প্রয়োজনীয়।

ছবি: জাকির হোসেইন/ টাইমস

এখানকার কারিগরেরা তবলা-বায়া, ঢোল, ঢাক, খোল বা শ্রীখোল, ধামসা, দুগি, কাঁদা ও ডমরুসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামত করেন। পুরোনো বাদ্যযন্ত্রের নষ্ট হয়ে যাওয়া চামড়া বদলে দেওয়া, নতুন পুড়ি লাগানো, তবলার সুর ঠিক করা এবং ঢোল-ঢাকের টান ও পিচ বা স্বর ঠিক করে দেওয়াও তাদের নিয়মিত কাজের অংশ।

এই কারিগরদের কাছে বাদ্যযন্ত্র তৈরি মানে শুধু কাঠ ও চামড়াকে জোড়া লাগানো নয়। একটি যন্ত্রের সঠিক সুর ও স্বর ধরে রাখতে তাদের কাঠের ধরন, চামড়ার মান, টানের মাত্রা এবং সিহাইয়ের ভারসাম্যের মতো অসংখ্য সূক্ষ্ম বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়।

একজন দক্ষ কারিগরের কাছে তাই প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র যেন এক একটি জীবন্ত সত্তা– যার নিজস্ব স্বর আছে, নিজস্ব মেজাজ আছে, আর আছে সঠিক হাতে প্রাণ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা।

আরও পড়ুন

বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পাথরঘাটার বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়ী ও কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। পূজা উপলক্ষ্যে মহালয়ার অনেক আগ থেকেই অর্ডার আসতে শুরু করে।

ছবি: জাকির হোসেইন/ টাইমস

চট্টগ্রাম নগরের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার পূজা আয়োজক, ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্র ও সরঞ্জাম কিনতে এ সময় পাথরঘাটায় আসেন।

এখানকার ৩৪ সতিশ বাবু লেনের মৃদঙ্গ ভাণ্ডারের মালিক দিলীপ জানান, বর্তমানে পূজাকেন্দ্রিক তবলা ও এ ধরনের বাকি সরঞ্জামের বিক্রি মোটামুটি ভালোই চলছে। বর্তমানে এক জোড়া তবলার দাম প্রায় ছয় হাজার টাকা। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় আড়াই কেজি ওজনের পিতলের বায়া, নীলঘাট তবলা, একটি ব্যাগ এবং এক জোড়া বায়া।

দিলীপ বলেন, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়াই তবলার দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। যে পিয়ারি আগে এক হাজার ৬০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম প্রায় দুই হাজার ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে অন্যান্য উৎপাদন খরচ এবং চামড়ার দামও বেড়েছে। এসব কারণে তবলার দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে বিক্রি বাড়েনি। আশপাশের অনেক ব্যবসায়ীর বিক্রিও এখন আগের মতো ভালো অবস্থায় নেই।

তারপরও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পাথরঘাটার কারিগরেরা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ছবি: জাকির হোসেইন/ টাইমস

সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাজার, বেড়েছে উৎপাদন খরচ, এসেছে নানা প্রতিকূলতা। তবু পাথরঘাটার কারিগরদের হাতের কাজ থেমে যায়নি। তাঁরা এখনো কাঠে হাত রাখেন, চামড়ায় টান দেন, সিহাই বসান, সুর মিলিয়ে নেন–আর ধীরে ধীরে একটি নির্জীব কাঠামোকে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দেন।

এই কারিগরদের হাত এমন এক ভাষা জানে, যা কোনো যন্ত্র পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না। সেই হাতে আছে শৈশব থেকে শেখা কারুশিল্পের ধৈর্য, বাবার কাছ থেকে ছেলের হাতে পৌঁছে যাওয়া ঐতিহ্যের ছন্দ, আর আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক নীরব উত্তরাধিকার।

পাথরঘাটার সরু গলিতে তাই শুধু বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয় না—তৈরি হয় স্মৃতি, টিকে থাকে ঐতিহ্য, আর কাঠ-চামড়ার ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে বাংলার সংগীতের এক পুরোনো সুর।

কারিগরের হাতের শেষ টান যখন একটি তবলাকে সুরে ফিরিয়ে দেয়, কিংবা ঢাকের চামড়ায় প্রথম আঘাতে যখন জেগে ওঠে উৎসবের শব্দ–তখন বোঝা যায়, এই শিল্প কেবল একটি পেশা নয়। এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া এক জীবন্ত সংস্কৃতি।

আরও পড়ুন: গানের গলি: সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে সুরের সংস্কৃতি

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad