ঢাকঢোলের বাদ্য, বৈঠার ছন্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে যেন ফিরে এসেছিল চিরচেনা গ্রামবাংলা। কালীগঙ্গার বুক চিরে ছুটে চলা রঙিন নৌকা আর নদীর দুই তীরে মানুষের ঢলে শনিবার উৎসবের নগরীতে পরিণত হয় মানিকগঞ্জের বেউথা ঘাট।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ দেখতে সকাল থেকেই কালীগঙ্গার দুই তীরে জড়ো হতে থাকেন দর্শনার্থীরা। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে। শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে নদীর দুই পাড় পরিণত হয় জনসমুদ্রে। কেউ তীরে দাঁড়িয়ে, কেউ নৌকায় চড়ে, আবার কেউ আশপাশের উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন নৌকার রোমাঞ্চকর লড়াই।
এবারের নৌকাবাইচে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইল ও পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিযোগীরা অংশ নেন। চারটি বিভাগে মোট ২২টি নৌকা প্রতিযোগিতায় নামে। এর মধ্যে খেল্লা-গয়ইটা বিভাগে ১০টি, ঘাসি-ছিপা বিভাগে পাঁচটি, ছান্দি বিভাগে চারটি এবং পানসি বিভাগে তিনটি নৌকা ছিল। পাশাপাশি ৭০ ও ৮০ হাত দীর্ঘ দুটি কলাগাছের ভেলাও অংশ নেয়।
প্রতিযোগিতা শুরু হতেই বৈঠার তালে তালে নদীর বুকে ছুটতে থাকে একের পর এক নৌকা। আর প্রতিটি নৌকা সামনে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তীর থেকে ভেসে আসে করতালি, হর্ষধ্বনি আর উচ্ছ্বাস। মুহূর্তেই কালীগঙ্গার দুই পাড় হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত এক লোকজ উৎসবের মঞ্চ।

প্রতিযোগিতার ছান্দি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘গায়ান বাড়ি’। পুরস্কার হিসেবে তারা পায় একটি ইলেকট্রিক মোটরবাইক। দ্বিতীয় হয় ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’, তৃতীয় ‘গায়ান তরী’ এবং চতুর্থ ‘সোনার চান’।
ঘাসি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘বাইমাইল এক্সপ্রেস’। খেল্লা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় কুড়িগ্রাম থেকে আসা ‘মায়ের দোয়া’। পানসি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘জনতা এক্সপ্রেস’। বিজয়ীদের দেওয়া হয় মোটরসাইকেল ও ইলেকট্রিক বাইকসহ বিভিন্ন পুরস্কার। বিভিন্ন বিভাগে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অর্জনকারীদের দেওয়া হয় ফ্রিজসহ অন্যান্য পুরস্কার।
নৌকাবাইচে বিশেষ নজর কাড়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে আসা একটি নৌকা।
আয়োজকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়নের বাগুয়ারচর গ্রাম থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে নৌকাটি মানিকগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করে। প্রায় তিন দিন নদীপথ পাড়ি দিয়ে সেটি পৌঁছায় বেউথা ঘাটে।
আয়োজকদের ভাষ্য, ভারতের শাল কাঠ দিয়ে নৌকাটি নির্মাণে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এটি তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় এক বছর। এবারের নৌকাবাইচই ছিল নৌকাটির প্রথম প্রতিযোগিতা।
নৌকাবাইচের উদ্বোধন ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। নৌকাবাইচ শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, এর সঙ্গে বাংলার নদী, মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরতে নৌকাবাইচের মতো আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কালীগঙ্গা নদী মানিকগঞ্জের মানুষের জীবন ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ নদীকে ঘিরে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের টান এখনো অটুট।
নৌকাবাইচ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য-সচিব মাসুদ পারভেজ বলেন, প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকাগুলোর জন্য বিভিন্ন আকর্ষণীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়। বিজয়ীদের জন্য মোটরসাইকেল, ইলেকট্রিক বাইক, ফ্রিজসহ বিভিন্ন পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
নৌকাবাইচ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ ত ম জহির আলম খান লোদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, পুলিশ সুপার গোলাম সারওয়ার আলম, জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।
আরও পড়ুন: আড়িয়াল খাঁ নদে নৌকাবাইচ


