পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি: ঢাকায় বিভক্ত বিশ্লেষক মহল

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি: ঢাকায় বিভক্ত বিশ্লেষক মহল
বিজেপির সদর দপ্তরে বক্তৃতা করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ডানপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বড় ধরনের উত্থান বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন দুই দেশের কূটনীতি, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা মত দেখা যাচ্ছে।

কেউ কেউ সীমান্ত গতিশীলতায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন। আবার অনেকের মতে, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি মূলত দিল্লি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এর প্রভাব হবে খুবই সীমিত।

বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের দাবি করে বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের কথা জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনামলের অবসান ঘোষণা করেছেন তিনি। এই ফলের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা শামা ওবায়েদ ইসলাম ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করলেও দুই দেশের সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, পুশইন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং পানিবণ্টনের মতো ইস্যুগুলোতে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে ভারতীয় ভিসা ব্যবস্থা আরও সহজ হবে বলেও তিনি প্রত্যাশা করেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীরও প্রায় একই ধরনের অভিমত পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই পরিবর্তনকে দেখা উচিত।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো রাজ্য সরকারের ভূমিকা খুবই সীমিত। বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। বাংলাদেশ যেকোনো নির্বাচিত প্রশাসনের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যাশা করে এবং আপাতত বড় কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছে না।

তবে দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস গবেষক ও কলামিস্ট আলতাফ পারভেজ কিছুটা ভিন্ন ও গভীর রাজনৈতিক সংকেতের কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই উত্থান অঞ্চলে উগ্র জাতীয়তাবাদের ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে নির্দেশ করে।

তার মতে, মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশকে বাংলাদেশি হিসেবে চিত্রায়িত করার যে বয়ান তা সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও জনমনে কী প্রতিক্রিয়া হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্প, কাঁচামাল আমদানি এবং যন্ত্রাংশ সংগ্রহের মতো প্রধান অর্থনৈতিক বিষয়গুলো কোনো রাজ্য সরকারের ওপর নির্ভর করে না। পর্যটন এবং চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সরাসরি ভূমিকা থাকলেও নির্বাচনের ফলাফল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না বলে তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে রাজি নন। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগের প্রচারণার ভাষা আর নির্বাচনের পরের শাসনের মধ্যে পার্থক্য থাকে। বিজেপি সরকার গঠন করলে তারা আসলে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা যৌক্তিক হবে। গঙ্গা বা তিস্তার পানিবণ্টনের মতো ইস্যুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে যে ভূমিকা নিয়েছেন সেটিও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।

তবে দিলারা চৌধুরী একটি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস ধর্মীয় উগ্রবাদ দ্বারা পরিচালিত ছিল না। কিন্তু বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও ধর্মীয় সম্প্রীতিকে প্রভাবিত করে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এটি পরোক্ষভাবে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রাখে।

অধিকাংশ বিশ্লেষক বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো বড় কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকট দেখছেন না। তবে তারা সামাজিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব কতটা পড়বে তা নির্ভর করবে দিল্লির নীতি, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং নতুন রাজ্য সরকারের আচরণের ওপর।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad