ফরিদপুরে নির্মাণের মাত্র ছয় বছরের মধ্যে পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে ৪০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু। প্রায় ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এই সেতু নির্মাণ করেছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
শনিবার সকালে ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের কবিরপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, সেতুটি ছিল ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কবিরপুর গ্রামে। ফরিদপুরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের আজমত আলী মণ্ডলের ডাঙি, মন্তাজ মাদবরের ডাঙি ও আদর্শ গ্রাম এবং মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেশড়াগঞ্জ ইউনিয়নের সেলিমপুর, জয়পুর, নতুন হাট, গঙ্গাবরদী, হরিহরদিয়া, পাটগ্রাম ও নাটখোলা—এই ১০টি গ্রামের অন্তত দুই হাজার মানুষ এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করতেন।
পদ্মা নদীর মূল ধারা সেতুটির পূর্ব পাশ দিয়ে মানিকগঞ্জের দিক দিয়ে গেছে। পশ্চিম পাশ দিয়ে ফরিদপুরের দিকে বয়ে গেছে আরেকটি শাখা। এই দুই ধারার মাঝখানের একটি চরে নির্মাণ হয়েছিল এই সেতু। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এলজিইডির একটি প্রকল্পের অধীনে নির্মিত এই সেতুটি দৈর্ঘ্যে ছিল ৪০ মিটার এবং চওড়ায় ১২ ফুট।
নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোস্তফা হোসেন জানান, এলাকায় গত দুই মাস ধরেই নদীভাঙন চলছিল। তবে শেষ ১৫ দিনে তা খুব ভয়াবহ রূপ নেয়।
তিনি টাইমস’কে বলেন, ‘গত চার দিন ধরে সেতুর পূর্ব পাশের রাস্তাটি নদীতে তলিয়ে যাচ্ছিল। শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সেতুর পূর্ব পাশের অংশটি ভেঙে নদীতে পড়ে যায়।’
মোস্তফা আরও জানান, গত দুই মাসের ভাঙনে আদর্শ গ্রামের ৫০টি ও আশপাশের ২০০ পরিবারসহ মোট ২৫০টি পরিবারের ভিটেমাটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি অন্তত ৮২৫ একর ফসলি জমিও নদীতে তলিয়ে গেছে।
নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তাকুজ্জামান জানান, সেতুর পূর্ব পাশের খুঁটির (পাইলিং) তলার মাটি ধুয়ে মুছে যাওয়ায় সেতুটি নদীতে তলিয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড সেতুটি রক্ষায় সেখানে বালুর বস্তা ফেলেছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া জানান, নদীভাঙন শুরু হওয়ার পর থেকে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘সেতুটি রক্ষায় ১৫০ মিটার এলাকায় বালুর বস্তা ফেলা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দেড় কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শেষ রক্ষা করা যায়নি।’
বর্ষার মধ্যে এর চেয়ে বড় কোনো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব ছিল না বলে তিনি জানান।
ফরিদপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম বলেন, গত ৩৫ বছরের মধ্যে এই এলাকায় এমন মারাত্মক নদীভাঙন দেখা যায়নি।
স্থানীয়দের মতে, ক্রমাগত ভাঙনের মধ্য দিয়ে নদীটি আবার তার পুরনো গতিপথে ফিরে যাচ্ছে।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হোসেন জানান, চরের মাঝখানে সেতুটি বানিয়েছিল এলজিইডি, যার দুই পাশ দিয়েই পদ্মার দুটি শাখা বইছিল। তিনি বলেন, ‘নদীর দুটি শাখাতেই তীব্র ভাঙন চলছে। নদী প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরে ঢুকে এসেছে এবং প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এখনও ভাঙন চলছে।’
নদীর পানি না কমা পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, পানি কমলে বিশেষজ্ঞ দল এনে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


