ব্যাংকের ঋণ, দোকানে সার-কীটনাশক বাকিতে নিয়ে মানুষের ৬০ একর জমি চুক্তিতে নিয়ে হাইব্রিড ‘ব্যাংকক সুইট-২’ জাতের মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছিলেন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার লাঙ্গল গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন।
সুন্দর পরিচর্যায় কুমড়া গাছে ঢেকে যায় পুরো খেত। আসতে শুরু করে ফুল। কিন্তু ফল আসে না। মৌসুমের শেষের দিকে হলেও দেখা নেই কোনো ফলের। ইতোমধ্যে সব মিলিয়ে তিনি খরচ করেছেন ৩৮ থেকে ৪০ লাখ টাকা। বীজ কোম্পানির কথামতো ফলন হলে এসব জমি থেকে তিনি বর্তমান বাজারে প্রায় দেড় কোটি টাকার মিষ্টি কুমড়া বিক্রয় করতে পারতেন বলে জানান।
জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগে সাজ্জাদ জানান, বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের সর্দারপাড়া ও পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের নলেহা গ্রামে বিভিন্ন লোকের কাছে ৬০ একর জমি একরপ্রতি ৬০ হাজার টাকা চুক্তিতে নিয়ে আলু চাষ করেন। কিন্তু আলুতে লোকসান হওয়ার পর সেই জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষের সিদ্ধান্ত নেন।
বোদা বাজারের সার-বীজ কীটনাশক ব্যবসায়ী আরিফুল রহমান রাসেলের পরামর্শে আলমগীর সীড কোম্পানির ‘ব্যাংকক সুইট-২’ জাতের মিষ্টি কুমড়ার বীজ সংগ্রহ করে জমিতে লাগান। কোম্পানি থেকে নিশ্চয়তা দিয়ে তাকে বলা হয়েছিল ‘এই বীজের মান খুব ভালো এবং প্রতি একরে ১৯ থেকে ২০ মেট্রিক টন ফলন আসবে’। তাদের কথামতো নিয়মিত পরিচর্যা, সেচ, সার ও কীটনাশক দিয়ে গাছের চেহারা অনেক ভালো হলেও তিন মাসেও কোনো ফল আসেনি। ইতোমধ্যে এই জমিতে তিনি প্রায় ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ভবিষ্যতে ফল আসারও কোনো সম্ভাবনা নেই।
জমির মালিক সর্দারপাড়া গ্রামের কাব্য ভূষণ বর্মন বলেন, ‘ছয় ভাই মিলে সাজ্জাদকে জমি দিয়েছি। আলু করে তিনি অনেক টাকা লোকসান করেছেন। সেই জমিতে তিনি কুমড়া চাষ করলে গাছ দিয়ে জমি ভর্তি হলেও কোনো ফল আসেনি। এটা বীজের দোষ। আমাদের জমির পাশে আরেকজন মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছেন। সেই জমি মিষ্টি কুমড়া দিয়ে ভরা। সাজ্জাদ ভাই আলু করে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিলেন, কুমড়া বিক্রয় করে বাকি টাকা দেবেন। কিন্তু ফল না আসায় আমরাও টাকা নিয়ে চিন্তিত আছি।’
সার-বীজ কীটনাশক ব্যবসায়ী মো. আরিফুল রহমান রাসেল বলেন, ‘আলমগীর সীডস কোম্পানি জানিয়েছে তাদের বীজ ভালো হবে। একরে ১৯ থেকে ২০ টন ফলন হবে। গত ২৬ জানুয়ারি কোম্পানিকে নগদ টাকা দিয়ে ১০ কেজি ৬০০ গ্রাম বীজ নিয়ে সাজ্জাদ ভাইকে দিই। তাদের নির্দেশনা মেনে সব করি। কিন্তু জমিতে প্রচুর গাছ থাকলেও মিষ্টি কুমড়া একটিও হয়নি। কোম্পানিকে বলেছিলাম বীজ নিয়ে সাজ্জাদ ভাইয়ের প্রচুর টাকা ক্ষতি হয়েছে। তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু এখন তারা নানাভাবে টালবাহানা করছে।’
সাজ্জাদ বলেন, ‘আমি পথে বসেছি। এখন কী করব। আলমগীর সীড কোম্পানি রাস্তায় নামিয়েছে। ঋণ আর ধারদেনা করে জমির মালিকের টাকা আর হাল ও মজুরির টাকা বাকি রেখে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ করেছি। এত টাকা কীভাবে শোধ করব। কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণ চাই। তা না দিলে আমি আদালতে যাব।’
জেলা বীজ ও প্রত্যয়ন কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শামীম বলেন, ‘কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ বীজ কিনে প্রতারিত হওয়ার একটি অভিযোগ দিয়েছেন, যার অনুলিপি পেয়েছি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। তিনি আসলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ নিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


