টানা বর্ষণ ও পানি বৃদ্ধির কারনে নেত্রকোনার বিভিন্ন হাওরে ৯ হাজার ৪৩৪ হেক্টর বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া অধিকাংশ ধানের জমিতে পানি জমে যাওয়ায় শ্রমিক সংকটে বিপাকে পড়েছে কৃষকরা। কৃষি বিভাগ বলছে হাওরে বেশীর ভাগ জমির ফসল এরই মধ্যে কাটা হয়েছে।
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার সুমাইখালী এবং মদনের গনেশের হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে কৃষকরা এখন কোমড় পানিতে নেমে তাদের ফসল কাটার চেষ্টা করছেন। বেশীর ভাগ জমিতে পানি জমে যাওয়ায় মেশিন দিয়ে ধান কাটতে পারছেন না তারা।
এ ছাড়া, বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের ঝুঁকিতে অনেকে ধান কাটতে যাচ্ছেন না। অনেক কৃষক তাদের স্কুল পড়ুয়া শিশু ও নারীদের সঙ্গে নিয়ে হাওর থেকে নৌকা দিয়ে ধান কেটে আনছেন। তবে রোদ না থাকায় ধান শুকাতে পারছেন না তারা । ফলে সময়মত ফসল ঘরে তুলতে না পারায় ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন অনেক কৃষক।
আটপাড়া উপজেলার সুমাইখালী হাওরে গিয়ে দেখা যায়, অনবরত বৃষ্টিতে হাওরের বেশির ভাগ জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার কৃষকরা ঝুঁকি নিয়েই ধান কাটার কাজে ব্যস্ত। কেউ হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন, কেউ কাটা ধান নৌকায় তুলে উঁচু জায়গায় নিচ্ছেন।
বৃদ্ধা ফিরোজা বেগম বলেন, ‘তিন ছেলেরে লইয়া অহন মাঠে নামছি ধান তুলার লাইগা। ধান পুরাপুরি পাকে নাই তাও যতটুকু পাই বাড়িতে নিয়ে যাইয়াম। না নিলে খাইয়াম কি’।
হাওরে শ্রমিক সংকটের কারণে প্রতিদিন শ্রমিকদের জনপ্রতি দিতে হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১২শ টাকা। বাড়তি খরচে যে ধান কাটা হয়েছে সেগুলোও ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না। ফলে একদিকে ধানের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে অপরদিকে ন্যায্য বাজার মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়, এ বছর হাওরে ৪৩ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ হাজার ৯শ ৮৯ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে আগামী ছয় দিনের মধ্যে হাওরে ধান কাটা শেষ হবে।
মোহনগঞ্জ উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের মানিক তালুকদার বলেন, ‘দিন-রাত এক করে ধান কাটছি। শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়ে গেছে, তবুও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই নিজের জমির ধান কাটতে ব্যস্ত। এর মধ্যে বৃষ্টি হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায় ।’
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জেলায় ছোট-বড় হাওর আছে ১৩৪টি। আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা।
এসব বাঁধের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৪৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে। তবে হঠাৎ করে পানির চাপ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা মূলত এ মৌসুমের বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। তাই দ্রুত কাঁটার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি আমরা।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে কৃষকের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফসল ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও জানান, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫শ ৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। আর ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭ শত ৩২ মেট্রিক টন। হাওর এলাকায় ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়েছে। বুধবার বিকাল পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ৬৬ শতাংশ।


