ভোট আসে, প্রতিশ্রুতি আসে বন্যার মতো, নেতা পাল্টায়। কিন্তু পাল্টায় না মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলবাসীর ভাগ্য। একের পর এক সংসদ নির্বাচন হলেও নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করা এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে টেকসই কোনো পরিবর্তন আসেনি। নির্বাচনের মঞ্চে প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি, আর ভোটের পর বাস্তবতা–ভাঙন, অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের ঘূর্ণিপাকে আটকে পড়া।
মোট ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত পদ্মা নদীবেষ্টিত হরিরামপুর উপজেলা। সরকারি নির্বাচন অফিসের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার মোট ভোটার সংখ্যা এক লাখ ৪১ হাজার ৬০৮ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭১ হাজার ৩৩৪, নারী ভোটার ৭০ হাজার ২৩৪ এবং হিজড়া ভোটার একজন। সরকারি ও স্থানীয় তথ্যে ১৩টি ইউনিয়নের মোট আয়তন প্রায় ৫৭৫ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার।
চরাঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত তিন ইউনিয়ন-লেছড়াগঞ্জ, আজিমনগর ও সুতালড়ির মোট আয়তন প্রায় ৩৬ দশমিক শূন্য ৩ বর্গকিলোমিটার। সর্বশেষ ভোটার তথ্য অনুযায়ী তিন ইউনিয়নে মোট ভোটার প্রায় ১৯ হাজার ৪ শত এবং জনসংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। এই সীমিত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের বড় অংশই স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত। পদ্মার গতিপথ পরিবর্তন ও তীব্র ভাঙনের কারণে প্রতিবছর বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। যার ফলে বারবার আশ্রয় বদলাতে বাধ্য হয় হাজার হাজার মানুষ।
চরাঞ্চলের প্রবেশের একমাত্র উপায় নদীপথ। স্থলপথের কোনো সংযোগ নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থায় যাত্রী এবং মালামাল বহনে এখনো তাদের ভরসা ঘোড়া অথবা গরুর গাড়ি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে ভ্যান গাড়ি। ইউনিয়ন তিনটিতে মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিসহ। শিক্ষা, যোগাযোগ এবং চিকিৎসাসেবার অবস্থা চরম দৈন্য।
সবচেয়ে গুরুতর দুর্ভোগের বিষয় হল চিকিৎসা। জরুরি প্রয়োজনে কেউ রোগী হলে এখানে কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালে যেতে হলে পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হয়, যা অনেক অসুবিধাজনক। রাত হলে চিকিৎসা নিতে প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ফলে অনেককে চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।
চরবাসীর অভিযোগ, নদীভাঙন প্রতিরোধে অস্থায়ী জিও ব্যাগ বা অন্যান্য ব্যবস্থা কার্যকরি হয়নি। বরং অনেক সময় এসব ব্যবস্থার কারণে ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। ভোটের সময় রাজনৈতিক প্রার্থীরা নদীভাঙন রোধ, সড়ক-সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু বাস্তবে স্থায়ী কোনো সমাধান দেখা যায় না।
লেছড়াগঞ্জের আরজিনা বেগম বলেন, ‘ভোটের সময় সবাই আসে, আমাদের কষ্ট শুনে যায়। ভোট শেষ হলে আর কেউ থাকে না। ঘর বানাই, নদী আবার নিয়ে যায়–এইভাবেই জীবন কাটছে।’ আজিমনগরের বেলায়েত আলী জানান, ‘বাপ-দাদার রেখে যাওয়া প্রায় ২০ বিঘা জমি পদ্মায় চলে গেছে। ভোট আসে, নেতা বদলায়, কিন্তু আমাদের দুঃখ বদলায় না।’
সুতালড়ি ইউনিয়নের যুবক শাকিল গাজী বলেন, ‘প্রতিটি নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি থাকে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ দেখি না।’
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে নদীভাঙন রোধ, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও চিকিৎসা নিরাপত্তা প্রার্থীদের মূল ইস্যু হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে উন্নয়ন পরিকল্পনার চেয়ে ভোটের অঙ্কই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে ভোট শেষে চরাঞ্চলবাসী আবারও নদীর সঙ্গে একা লড়াইয়ে নেমে পড়ে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা আর নতুন প্রতিশ্রুতি চায় না। তারা চায় টেকসই বেড়িবাঁধ, স্থায়ী নদীশাসন, নিরাপদ স্থল ও নৌপথ যোগাযোগ, পরিকল্পিত পুনর্বাসন এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা। এসব বাস্তবায়ন না হলে নির্বাচন আসবে, নেতা পাল্টাবে–কিন্তু হরিরামপুরের চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলাবে না।


