বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করেন সীমা বেগম। দীর্ঘ বছর ধরে তিনি উচ্চরক্তচাপ বা হাইপারটেনশনে ভুগছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নিয়মিত ওষুধ পাওয়ায় তার শারীরিক অবস্থা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। প্রতিবার ওষুধ সংগ্রহ করতে যাওয়ার যাতায়াত খরচ এবং সময়ের বিষয়টি ছিল তার জন্য একটি বড় বাধা।
কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে উচ্চরক্তচাপের ওষুধ দেওয়ার সরকারি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত সীমা বেগমের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে আসে। এতে তার যাতায়াত সময় এবং খরচ দুই-ই বেঁচে যায়। তবে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে তিনি এই উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না।
সীমা বেগমের এই অভিজ্ঞতা দেশের হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষের প্রাত্যহিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। ওষুধের ঘাটতির কারণে অনেকেই নিয়মিত ওষুধ সংগ্রহ করতে পারেন না। এর ফলে দেশজুড়ে কার্যকরভাবে উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’ অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ দশটি রোগের মধ্যে উচ্চরক্তচাপের অবস্থান প্রথম। এর অর্থ, এই ‘নীরব ঘাতকের’ ঝুঁকিতে আছেন বিশাল সংখ্যক মানুষ। অথচ তাদের একটি বড় অংশ নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো দেশের সব কমিউনিটি ক্লিনিকে উচ্চরক্তচাপের ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। মানুষের দোরগোড়ায় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে রোগ নিয়ন্ত্রণে অর্থবহ অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে।
তবে তৃণমূল পর্যায়ে সবার জন্য ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রধান কারণ অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ। বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪.২ শতাংশ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য বরাদ্দ করা হয়—যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। অথচ মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে অনেক বেশি। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২০০ মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যান, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ। এর মধ্যে ১৯ শতাংশই অকাল মৃত্যু।
পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাবে কমিউনিটি ক্লিনিক এবং এনসিডি কর্নারগুলোতে ওষুধের সরবরাহ প্রায়ই ব্যাহত হয়। একারণে প্রায়ই ওষুধের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলস্বরূপ, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সবসময় বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। ওষুধের অনিয়মিত সরবরাহ প্রায়ই দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষকে ওষুধ কেনা থেকে নিরুৎসাহিত করে, যা তাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তাই নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নের ধীরগতি গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে।
এমন অবস্থায়, উচ্চরক্তচাপের মতো নীরব ঘাতকের কবল থেকে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে দেশের সকল কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারগুলোতে উচ্চরক্তচাপের ওষুধের পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং অব্যাহত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন ও চাহিদানুযায়ী ওষুধ সরবরাহ সম্ভব হবে। এটি প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করবে। একই সাথে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডসহ সকল সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়। মাঠ পর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে সীমা বেগমের মতো অনেক মানুষকে আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে উচ্চরক্তচাপের ওষুধ এবং ধীরে ধীরে উচ্চরক্তচাপ ও এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব কমে আসবে।
*লেখক: মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস-বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড (কার্ডিওভাসকুলার হেলথ), গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর। এবিএম জুবায়ের-নির্বাহী পরিচালক, প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা)।


