ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (জাপা) আদৌ অংশ নিতে পারবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে নানা সংশয় এবং চ্যালেঞ্জ থাকলেও নীরবে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন জাপা নেতারা।
জাপা প্রতিষ্ঠাতা হুসেইম মুহাম্মদ এরশাদের ভাই জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন দলটির প্রার্থী তালিকা ঠিক করতে এরই মধ্যে জেলাগুলোয় সফর করতে শুরু করেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
দলটির অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সূত্র টাইমস অব বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে যে, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখাতে জাপাকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হবে না বলে অনানুষ্ঠানিক বার্তা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বিএনপিও জামায়াতকে চাপে রাখার কৌশল এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে দলটিকে ভোটের বাইরে রাখার বিপক্ষে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রাজনীতি বিশ্লেষক আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, ‘যেহেতু আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে তাই দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনা এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হলে জাপার আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।’
ভোট করতে এখন পর্যন্ত আইনগত বাধা না থাকলেও দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল জাপার ব্যাপারে ইতিবাচক নয়। তাই দলটি প্রার্থীদের এখনই নাম প্রকাশ করে ঝামেলায় ফেলতে চাইছে না। এক্ষেত্রে তারা কৌশল অবলম্বন করছে। তফসিল ঘোষণার আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুকূলে আসার অপেক্ষায় রয়েছে জাপা।
জামায়াত ইসলামী, এনসিপি এবং গণঅধিকার পরিষদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের বেশকিছু ছোট দল জাপাকে নিষিদ্ধ করে ভোটের বাইরে রাখতে চায়। এসব দলের অভিযোগ আওয়ামী লীগকে ‘স্বৈরাচার’ হয়ে উঠতে সহযোগিতা করেছিল জাতীয় পার্টি।
তবে দলগুলো যাই বলুক না কেন, জাপাকে বাইরে রেখে নির্বাচন করতে গেলে আওয়ামী লীগের আমলে অনুষ্ঠিত বেশিরভাগ নির্বাচনের মতো এবাবের সংসদ নির্বাচনও বহির্বিশ্বের কাছে ‘একতরফা’ তকমা পেতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। যা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বাধা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তখন যখন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী দৌড়ের বাইরে রয়েছে।
এসব নানা আলোচনা এবং সার্বিক বিষয় মাথায় রেখেই জাপা সামনে এগোচ্ছে বলে জানালেন জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে পরিবেশ তাতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কোনো অবস্থা নেই। বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না। তাই আমরা আশা করছি সরকার জাপাসহ সব দলকে ভোটে আসার পরিবেশ করে দেবে। এমনকী আওয়ামী লীগের ক্লিন ইমেজধারী অথবা দলটিকে রিফাইন্ড করে ভোটে আসার সুযোগ করে দেবে।’
জাপা আওয়ামী লীগের ক্লিন ইমেজধারীদের মনোনয়ন দেবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ নয়, যেকোনো ভালো প্রার্থী পেলে আমরা মনোনয়ন দেবো।’
দলটির একাধিক সূত্র বলছে, জাপা এবার প্রার্থী নির্বাচনে বেশ কৌশলী। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের ভোট ব্যাংক কাজে লাগাতে চায় জাপা। তাই আওয়ামী লীগের সরাসরি পদ-পদবিতে নেই কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনপ্রিয় ব্যক্তিদেরকে প্রার্থী করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বর্তমানে প্রার্থী তালিকা ঠিক করতে জাপা নেতারা কাজ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে প্রায় ২০০ আসনে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঠিক করা হয়েছে। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে অবশিষ্ট আসনে প্রার্থী তালিকা করা হবে। করে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।
আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই সব আসনে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে চায় জাপা। সে অনুযায়ীই কাজ করছেন দলটির নেতারা।
যদিও দলটির নেতাদের মধ্যে নির্বাচন অংশগ্রহণ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন।
তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচন অংশগ্রহণ করতে পারব কিনা জানি না। একদিকে সরকার ও অন্যদিকে বেশিরভাগ রাজনেতিক দল আমাদের বিপক্ষে। তাই চলমান পরিবেশে ভোট করতে যাওয়া মানেই প্রার্থী এবং কর্মীদের জন্যে জীবনের ঝুকিঁ তৈরি হওয়া।’
তিনি বলেন, ‘জাপা নির্বাচন করতে চায়। তাই আমরা নজর রাখছি যে সরকার আসলেই নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে কিনা সেদিকে। দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হলে জাপাকে নির্বাচনে রাখতে হবে।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ চাপের মুখে পড়ে জাপা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে ‘তথাকথিত’ বিরোধী দল ছিল জাপা।
সরকার পতনের পর দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরসহ শীর্ষ নেতাদের নামে মামলা হতে থাকে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় জাপার কেন্দ্রীয় কার্যালয়।
পরবর্তীতে চলতি বছরের শুরু থেকে জাপা নানা বিষয়ে সরকারবিরোধী অবস্থানে সরব হয়। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জড়িত থাকার ঘটনায় মামলা হলেও দলটির শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার না হওয়ায় জাপার শক্তির উৎস সম্পর্কেও কৌতূহল ডালপালা মেলতে থাকে।
গত ২৯ আগস্ট জাপা নিষিদ্ধের দাবিতে কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে নিজেদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে হামলার শিকার হন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। যে হামলার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল।
নুরের উপর হামলার পর জাপা নিষিদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে জামায়াত, এনসিপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল। যদিও বিএনপি দলটিকে নিষিদ্ধ না চেয়ে কৌশলগত অবস্থান নেয়।
১৯৮৬ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাতে গড়া জাপা এখন ছয় খণ্ডে বিভক্ত। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে ২০২৪ সালে পতনের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সরকারের অংশীজন হিসেবে ছিল জাপা। স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগের পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়, দলটি পড়ে যায় নাজুক অবস্থানে।
সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আগামী নির্বাচনে জাপা ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, সেটিই এখন সবার প্রশ্ন।


