আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে জনমনে থাকা যাবতীয় সংশয় ও অনিশ্চয়তা কাটাতে দৃশ্যমান প্রস্তুতি শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ভোটের পরপরই নির্বাচিত সরকারের কাছে কোনো ধরনের বিলম্ব ছাড়াই দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছে বর্তমান প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে পরবর্তী মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য আগাম যানবাহন প্রস্তুত করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে পরবর্তী মন্ত্রিসভার সদস্যদের ব্যবহারের জন্য সরকারি মনোগ্রাম ও ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড যুক্ত প্রায় ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গত সোমবার সরকারি পরিবহন অধিদপ্তরকে এই ৫০টি গাড়ির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য দাপ্তরিক চিঠি পাঠানো হয়েছে।
‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর হাতে আসা ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচনের পরপরই নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পরও বিভিন্ন মহলে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের সদিচ্ছা নিয়ে যে ধোঁয়াশা ছিল, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তা অনেকটাই কেটে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন ও গণভোটের মাত্র ৯ দিন আগে নেওয়া এই উদ্যোগকে একটি ষ্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছিল। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রস্তুতির মাধ্যমে সরকার প্রমাণ করতে চাইছে, তারা একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের জন্য গাড়ি কেনা হয়েছিল। তখন পূর্ণ মন্ত্রীরা টয়োটা ক্যামরি হাইব্রিড গাড়ি এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা মিতসুবিশি ল্যান্সার ইএক্স মডেলের গাড়ি ব্যবহার করতেন। ২৫০০ সিসি ইঞ্জিনের মন্ত্রীদের ক্যামরি হাইব্রিড গাড়িগুলোর প্রতিটির দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টাকা। অন্যদিকে ১৬০০ সিসি ইঞ্জিনের ল্যান্সার ইএক্স গাড়িগুলোর দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা এক দশক আগে কেনা সেই গাড়িগুলোই ব্যবহার করছেন। তবে ঢাকার বাইরে ভ্রমণের সময় তারা প্রায়ই বিভিন্ন সরকারি সংস্থার জিপ গাড়ির ওপর নির্ভর করেন।
আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব মন্ত্রীকে ২৪২৭ সিসি ইঞ্জিনের নতুন পাজেরো কিউএক্স গাড়ি দেওয়ার কথা ছিল, যার প্রতিটির দাম প্রায় এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে নতুন কোনো গাড়ি কেনা হবে না।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারি পরিবহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার খায়রুল কবির মেনন ‘টাইমস’-কে জানিয়েছেন, আসন্ন মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য বর্তমানে নতুন গাড়ি কেনার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি জানান, নতুন মন্ত্রীরা প্রায় ১০ বছর আগে কেনা টয়োটা ক্যামরি হাইব্রিড এবং মিতসুবিশি ল্যান্সার ইএক্স গাড়িগুলোই ব্যবহার করবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে যে যানবাহন আছে, তা দিয়েই আমরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করব।’
গত বছরের আগস্টে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রী, মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের জন্য ৬০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। পরে সরকার সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, পরবর্তী সরকারের মন্ত্রীদের জন্য নতুন কোনো গাড়ি কেনা হবে না।
৬০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাবে যুক্তি দেওয়া হয়, সরকারি পরিবহন পুলে উপদেষ্টা ও মন্ত্রীদের জন্য মানসম্মত যানবাহনের অভাব রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যেই ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কেনা পুরনো গাড়ি ব্যবহার করছে। সেখানে আরও বলা হয়, পুরনো গাড়িগুলো ঘন ঘন মেরামতের প্রয়োজন হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, এই পুরনো গাড়িগুলো দিয়ে নতুন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের নিজ নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াত করা এবং জরুরি সরকারি কাজ পরিচালনা করা কঠিন হবে। কর্মকর্তারা ১০ বছরের পুরনো এই গাড়িগুলো তাদের কার্যকর আয়ুষ্কাল পার করে ফেলেছে বলে বর্ণনা করেন।


