ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মাঠে টিকে থাকা নিয়ে ক্রমেই শঙ্কা বাড়ছে জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীদের। যার নেপথ্যে রয়েছে, জাপাকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগঠনগুলোর নতুন তৎপরতা।
এরই মধ্যে ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগঠন ‘জুলাই ঐক্য’র পক্ষে জাপা প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়েছে। পাশাপাশি সোমবার সংগঠনটি জাপাসহ ১৪ দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে দুইদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
এছাড়া গত শনিবার বগুড়ায় জেলা জাপার কার্যালয় দখল করে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান গবেষণা কেন্দ্র’র সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে।
জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাপার মূল অংশের নেতাদের আশঙ্কা, আগামী ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে দলটির সম্ভবনাময় প্রার্থীদের ওপর হামলা হতে পারে।
তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের বাইরে রাখতে সব চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে জুলাই যোদ্ধাদের নামে দুটি রাজনৈতিক দলের অনুসারীরা নতুন করে জাপার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে।
দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটেয়ারী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘জাপাকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে যেভাবে মব শুরু হয়েছে তা নিয়ন্ত্রণে যদি সরকার ও ইসি ব্যর্থ হয় তাহলে আমাদের নির্বাচনে টিকে থাকা কঠিন হবে। সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকলে জাপার জন্য সম্ভবনাও রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে আমাদের অনেক জনপ্রিয় প্রার্থীর ওপর হামলা হতে পারে। যারা জাপাকে হুমকি মনে করছে, তারাই সেটি ঘটাতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকার ব্যবস্থা না নিলে আমরা ভোট বর্জনও করতে পারি।’
তবে, জাপার প্রার্থীদের ওপর এখন পর্যন্ত কোন ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেনি।
জাপার দফতর সম্পাদক মাহমুদ আলম টাইমসকে বলেন, ‘২৪৪ আসনে জাপা প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেন। বাছাইয়ে ১৭২ জনকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। গত দুইদিনের আপিলে ২১ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। অর্থাৎ ১৯৩ জন প্রার্থী ইতোমধ্যে বৈধ। আপিলে আরো কয়েকজনের মনোনয়নপত্র ফিরে পাওয়া গেলে নির্বাচনে ২০০ জনের কাছাকাছি প্রার্থী ‘লাঙল’ প্রতীক নিয়ে মাঠে থাকবেন।’
জাপা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কিনা তা নিয়ে বেশ সংশয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের ভোট করছেন রংপুর-৩ ও মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ ও ৫ আসন থেকে ভোট করছেন।
গত ২৯ আগস্ট জাপা নিষিদ্ধের দাবিতে কর্মসূচি পালনকে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নূরুল হক নুরের ওপর হামলার পর দলটি নিষিদ্ধে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল কর্মসূচি পালন করে। দলটিকে ফ্যাসিস্ট এর ‘সহযোগী ও ভারতপন্থী’ আখ্যা দিয়ে আগে থেকেই নিষিদ্ধের দাবি করে আসছিল দলগুলো।
তবে, বড় দল বিএনপি দলটিকে নিষিদ্ধের সরাসরি পক্ষ না নিয়ে কৌশলগত অবস্থান নেয়। অনেকের ধারণা, জামায়াতকে চাপে রাখার কৌশল এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে দলটিকে ভোটের বাইরে রাখার বিপক্ষে বিএনপি।
এদিকে, গত কয়েকদিন থেকে জাপাকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে জুলাই যোদ্ধাদের সংগঠন ‘জুলাই ঐক্য’ ফের বেশ সক্রিয়।
জাপার মূল অংশের পাশাপাশি দলটির দলছুট নেতাদের নেতৃত্বে (একাংশ) ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)’ জোটের প্রার্থীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার নির্দেশনা চেয়ে গত ৬ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট করে ‘জুলাই ঐক্য’।
১১ জানুয়ারি উচ্চ আদালত এসব প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার নির্দেশ এবং এসব প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল প্রশ্নেও রুল জারি করেছেন।
সোমবার সংগঠনটি জাতীয় পার্টি, ১৪ দল ও এনডিএফ জোটের প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, ১৩ জানুয়ারি দুপুর ১২টায় ‘মার্চ টু ইসি’ও স্মারকলিপি প্রদান এবং পরদিন ১৪ জানুয়ারি বিভাগীয় শহরে ‘মার্চ টু বিভাগীয় নির্বাচন কমিশন কার্যালয়’।
এদিকে, পতিত আওয়ামী লীগের শেষ চারবারের শাসনামলের শেষদিন পর্যন্ত সহায়তাকারী জাপার ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে জনপ্রিয়তা কমেছে হতাশাব্যঞ্জক হারে। যার ফলে, রংপুর বিভাগে এখনো ২টি এবং রাজশাহী বিভাগের ১৪টি আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি দলটি।
এদিকে, সরকার একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখাতে জাপাকে নির্বাচনের বাইরে রাখবে না বলে দলটির কাছে বার্তা রয়েছে। কারণ, আওয়ামী লীগ এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়ে নির্বাচনের বাইরে। ফলে, নতুন করে জাপাকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্নের মুখেও পড়তে পারে সরকার।
১৯৮৬ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাতে গড়া জাপা এখন ৬ খণ্ডে বিভক্ত।


