দেশজুড়ে নির্বাচন-কেন্দ্রিক সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সশস্ত্র হামলাকারীদের লক্ষ্য করে ‘দেখামাত্র গুলি’ করতে পুলিশ কনস্টেবলদের সাবমেশিন গান (এসএমজি) ব্যবহারের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই সহিংসতা-প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম। সম্প্রতি সেখানে একাধিক ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, যা আসন্ন নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহকে চট্টগ্রামে গুলি করা এবং ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের প্রার্থী উসমান হাদীর ওপর বন্দুক হামলার মতো সাম্প্রতিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে এই পদক্ষেপ নিল সিএমপি।
সিএমপি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী প্রচারের সময় সশস্ত্র হুমকি মোকাবিলা করার জন্য কনস্টেবলদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু করেছে পুলিশ বাহিনী। প্রাথমিকভাবে অন্তত এক হাজার কনস্টেবলকে এই প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু চেকপোস্টে ডিউটির সময় নয়, বরং যে কোনো জায়গায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আক্রমণ দ্রুত মোকাবিলার জন্য এসএমজি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রশিক্ষণ মডিউলের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত ফায়ারিং, কৌশলগত চলাচল, হুমকি শনাক্ত করা এবং অনিচ্ছাকৃত ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে সশস্ত্র আক্রমণকারীদের নিষ্ক্রিয় করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় একশ’ কনস্টেবল এই প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন। আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও ব্যাচ কনস্টেবল প্রশিক্ষণ নেবে।
‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশ
সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ জানান, ‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশটি তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টিকারী সশস্ত্র ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে।
রোববার ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, এই নির্দেশ নির্বিচারে প্রয়োগ করা হবে না। শুধু সশস্ত্র সহিংসতার মুখোমুখি হলে প্রার্থী, ভোটার এবং আইন প্রয়োগকারী কর্মীদের জীবন রক্ষা করার জন্যই এই নির্দেশ পালন হবে। বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যমান আইনের আওতায় এটি কার্যকর করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রার্থীদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর পুলিশ নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি পুনর্বিবেচনা করেছে। পুলিশের লক্ষ্য হল প্রশিক্ষিত কনস্টেবলরা নির্বাচনের সময় সশস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় যেন কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারে।
শক্তি প্রয়োগের আইনি ভিত্তি
পুলিশ কর্মকর্তারা ‘দেখামাত্র গুলি করার’ নির্দেশের প্রচলিত আইনগত ভিত্তির কথাও ব্যাখ্যা করেছেন। তারা জানান, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৯৬ থেকে ১০৬ ধারা ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব ধারায় জীবন বা অঙ্গহানির হুমকি থাকলে পুলিশকে প্রাণঘাতি শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দণ্ডবিধির ১০০ ধারা মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের যুক্তিসংগত আশঙ্কা দেখা দিলে আত্মরক্ষার হামলাকারীকে সরাসরি গুলি করে মেরে ফেলার মত ক্ষমতাও দেয়।
এ ছাড়া, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬(৩) ধারা পুলিশকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টার সময় যদি সেই ব্যক্তি সহিংসভাবে প্রতিরোধ করে বা পালানোর চেষ্টা করে তখনো সরাসরি গুলি করার ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ রেগুলেশনসেও চরম পরিস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে কর্মপদ্ধতিগত নির্দেশিকা রয়েছে।
শহরজুড়ে মোতায়েন
সিএমপি’র সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম শহরের ৩২টি চেকপোস্টের কনস্টেবলদের ইতোমধ্যে এসএমজি দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। উন্নত নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সমস্ত টহল দলকে এই অস্ত্র সরবরাহ করার কথা রয়েছে।
সিএমপি কর্মকর্তারা আরও জানান, সশস্ত্র ক্যাডারদের চিহ্নিত করতে এবং হঠাৎ সহিংসতা প্রতিরোধ করতে প্রশিক্ষিত কনস্টেবলদের পাশাপাশি সিএমপি গোয়েন্দা ইউনিটগুলো কাজ করছে।
প্রার্থীদের উদ্বেগ
দল-মত নির্বিশেষে আসন্ন নির্বাচনের প্রার্থীরা জানিয়েছেন, গুলিবর্ষণের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। চট্টগ্রাম-১০ আসনের এনসিপি প্রার্থী সেগুপ্তা বুশরা মিজমা বলেন, কোনো প্রার্থীই এখন পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছেন না।
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম-৮ এবং ঢাকা-৮ এ যা ঘটেছে, তার পর থেকে আমরা এলাকা পরিদর্শন, সভা বা নিরাপত্তা ছাড়া চলাচলের আগে সব সময় ঝুঁকি বিবেচনা করি।’ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে স্বাগত জানালেও তিনি নিরাপত্তা সমন্বয়ের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, সহিংসতা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের জন্য প্রার্থী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে স্পষ্ট যোগাযোগ অপরিহার্য। নির্বাচনের পরিবেশকে উত্তেজনাপূর্ণ ও অপ্রত্যাশিত বলে বর্ণনা করেছেন বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান।
তিনি বলেন, গুলিবর্ষণের ঘটনাগুলি ভীতিকর বার্তা দিয়েছে। প্রার্থীর কর্মীরা ভয় পাচ্ছে। পুলিশের এসএমজি প্রশিক্ষণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে হয়তো নিরুৎসাহিত করতে পারে, কিন্তু সহিংসতার মূল কারণগুলিরও সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আবু সুফিয়ান।
প্রচারে সতর্ক থাকার আহ্বান পুলিশের
সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, নিরাপত্তা কেবল শক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে না। তিনি তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে এবং সহিংসতায় যুক্ত ব্যক্তিদের এড়িয়ে চলতে প্রার্থীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রার্থীদের সন্ত্রাসী বা সহিংস কার্যকলাপের রেকর্ড আছে এমন ব্যক্তিদের এড়িয়ে চলতে বলেছি। পুলিশ যদি নির্বাচনী সমাবেশে কোনো দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করে, তবে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব এবং তাদের আটক করব।’
শক্তি প্রয়োগ নিয়ে ভিন্নমত
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা সতর্ক করে বলেছেন, পুলিশের পদক্ষেপ সবসময় সতর্ক হতে হবে। ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, “হুমকির মাত্রার সঙ্গে পদক্ষেপ আনুপাতিক হতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে এমন কিছু নেই যে কাউকে ‘ব্রাশফায়ার’-এর শিকার হতেই হবে।”
তিনি আরও বলেন, যদিও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত সশস্ত্র ব্যক্তিদের–বিশেষ করে পাহাড়ী এলাকায় পরিস্থিতি অনুযায়ী গুলি করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে আইন সরাসরি গুলি করার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের নির্দেশ দেয় না। তিনি বলেন, ‘পুলিশ প্রশিক্ষণ বিভিন্ন পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে তা কভার করে।’
এদিকে, ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এস এম সাজ্জাত আলী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে পার্থক্য টেনেছেন।
তিনি বলেন, ‘ঢাকায় কর্মরত অপরাধীরা অতটা কঠোর নয়। এদেরকে মোকাবিলা করার জন্য পুলিশের পিস্তলই যথেষ্ট। চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ভিন্ন।’
কঠোর হচ্ছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি
বন্দর নগরী চট্টগ্রামে নির্বাচনী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পুলিশ কতটা কঠোর তা কনস্টেবলদের এসএমজি প্রশিক্ষণ এবং ‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশ থেকেই বোঝা যায়। এরপরও, কিছু প্রার্থী মনে করেন, যারা উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্নদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা দরকার। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, শুধু শক্তি প্রয়োগ করে নির্বাচনী সহিংসতার গভীর কারণগুলোর সমাধান করা যাবে না।


