নিরাপত্তা: পুলিশ নয়, আনসার সদস্য হবেন গানম্যান

নিরাপত্তা: পুলিশ নয়, আনসার সদস্য হবেন গানম্যান
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের গানম্যান দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। তবে পুলিশ নয়-গানম্যান হিসেবে দেওয়া হবে সশস্ত্র আনসার সদস্য। আর অর্থ পরিশোধ করে সেই গানম্যান নিতে হবে। এ কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। সারা দেশে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ নামে বিশেষ অভিযান চললেও জনমনে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ফিরছে না।

অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দৌড়ঝাঁপ বেড়ে যাওয়ায় মাঠ পর্যায়ের পুলিশ ও প্রশাসন ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করার কাজ চলছে। এর মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা প্রার্থীদের একটি আলাদা তালিকা তৈরি করেছে।

ব্যক্তি নিরাপত্তায় গানম্যান

বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে সরকার অনেককে গানম্যান হিসেবে সশস্ত্র আনসার সদস্য দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রার্থীরা চাইলে নির্দিষ্ট আবেদন ও টাকা জমা দিয়ে গানম্যান নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে আনসার সদস্যরা গানম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। তবে ঢালাওভাবে সবাইকে গানম্যান দেওয়া হবে না; শুধুমাত্র যাদের ঝুঁকি রয়েছে তাদেরই এই সুবিধা দেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, পুলিশের জনবল সংকট রয়েছে এবং নির্বাচনের সময় পুলিশের কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে, তাই গানম্যান হিসেবে পুলিশ সদস্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

অবশ্য অনেক প্রার্থী এই সুযোগ গ্রহণ করেছেন, আবার অনেকে নেননি। এ ছাড়া অনেকে নিজের ও কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য গানম্যান ও ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন। তবে গানম্যান এবং লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ভোটের মাঠে প্রার্থী ও ভোটারদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সম্প্রতি পল্টনে ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সরকার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা করে গানম্যান ও অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গানম্যান পাওয়ার যোগ্যদের তালিকায় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, এনসিপি নেতা আখতার হোসেন, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা এবং গণঅধিকার পরিষদ নেতা নুরুল হক নুর ও সদ্য বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খানের নাম রয়েছে। তবে নুর ও রাশেদ গানম্যান নিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের জন্য সার্বক্ষণিক গানম্যান ও বাসভবনে সশস্ত্র পুলিশ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আন্দালিব রহমান পার্থ, কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, জোনায়েদ সাকি, মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম ও ফয়জুল করীম, বিএনপির প্রার্থী মেহেরপুর-১ আসনের মাসুদ অরুণ, গোপালগঞ্জ-১ আসনের সেলিমুজ্জামান সেলিম ও গোপালগঞ্জ-৩ আসনের এসএম জিলানী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মুহাম্মদ শাখাওয়াত হোসাইন হিরুসহ অনেকে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন। এ ছাড়া বিএনপির প্রার্থী ঢাকা-৪ আসনের তানভীর আহমেদ রবিন ও পাবনা-৩ আসনের হাসান জাফির তুহিনসহ প্রায় ২৫ জন সরকারি কর্মকর্তাও অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তালিকা অনুযায়ী ইতোমধ্যে ২০ জনকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। এসবির ঢাকার প্রধান ডিআইজি মীর আশরাফ আলী জানিয়েছেন, তালিকাটি এসবি হেডকোয়ার্টার্স থেকে অনুমোদিত হয়েছে এবং অনেকেই নিরাপত্তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলার ঝুঁকি

গত ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে নানা চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ অস্ত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, গুজব ছড়ানো, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ঢালাও জামিন এবং সীমান্ত নিরাপত্তার দুর্বলতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কর্মকর্তারা বিচার বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জামিন বন্ধ রাখা, কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করা, সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো এবং দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ মোট ২২৬ জন কর্মকর্তা অংশ নেন।

নিরাপত্তার উদ্বেগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, বাস্তবতা বিবেচনায় নির্বাচন ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জামিনে থাকা এবং জেল পলাতক সন্ত্রাসীরা নির্বাচনের আগে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের গানম্যান বা অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঝুঁকির যে মূল কারণগুলো রয়েছে, সেগুলো সমাধান করা জরুরি। প্রার্থীরা যদি ভয়ভীতিহীনভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে না পারেন, তবে কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক থাকা স্বাভাবিক। কারণ, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে চাইবে না। তাই প্রার্থীসহ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব।

রাজধানীতে রেড জোন

এদিকে রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকাকে অস্ত্রধারীদের তৎপরতার কারণে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। ডিএমপির তথ্যমতে, আটটি বিভাগে সাড়ে চারশর বেশি তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও তাদের কাছে প্রায় দেড় সহস্রাধিক অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। এসব এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ডিবি পুলিশ।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সন্ত্রাসীদের প্রভাব রুখতে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট-২’ জোরদার করা হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad