আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পাঁচ আগস্টের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জামায়াত যখন নিজেদের একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দল হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছে, তখন আমিরের এই বক্তব্যগুলো দলের ভেতরকার পুরনো ও কট্টর রক্ষণশীল চিন্তাধারাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে নারী নেতৃত্ব, কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থান এবং ইসলামী আইনের প্রয়োগ নিয়ে তাঁর যুক্তিগুলো একবিংশ শতাব্দীর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শুরুতেই আসা যাক নারী নেতৃত্বের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। অথচ জামায়াতের শীর্ষ পদে কোনো নারী আসতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নে ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, “এটি সম্ভব নয়।” তার মতে, আল্লাহ সবাইকে নিজস্ব সত্তায় তৈরি করেছেন এবং মানুষের পক্ষে তা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, নারীদের কিছু শারীরিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে যা তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তখন তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি প্রকারান্তরে নারীর সক্ষমতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে যখন তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে বাংলাদেশ গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নারী প্রধানমন্ত্রীরা শাসন করেছেন, তখন আমিরের উত্তর ছিল আরও বিস্ময়কর। জামায়াত দীর্ঘদিন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জোট রাজনীতি করেছে এবং তার মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব করেছে। এ প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেওয়া ছিল বিএনপির সিদ্ধান্ত”।
ডা. শফিক দাবি করেন, জামায়াত অন্য কোনো দলের ওপর নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে চায় না। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যে পদকে তিনি খোদ নিজের দলের জন্য ‘অসম্ভব’ এবং ‘প্রাকৃতিক নিয়মের পরিপন্থী’ বলে মনে করেন, সেই একই পদে একজন নারীর অধীনে থেকে রাজনীতি করা কি আদর্শিক দ্বিচারিতা নয়? তাঁর এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে জামায়াত রাজনৈতিক প্রয়োজনে নারী নেতৃত্ব মেনে নিলেও আদর্শগতভাবে আজও তা গ্রহণ করতে পারেনি।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে নারী নেতৃত্বের উদাহরণ প্রসঙ্গেও আমিরের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বেশ নেতিবাচক। তিনি আল জাজিরার সাংবাদিককে উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, বিশ্বের কতটি উন্নত দেশে নারী নেতৃত্ব সামনে এসেছে? তিনি দাবি করেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশই নারী নেতৃত্বকে সঠিক বলে মনে করে না। তার এই মন্তব্য কেবল ভুল তথ্য নয়, বরং এটি জার্মানি, নিউজিল্যান্ড কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর সফল নারী রাষ্ট্রনায়কদের ইতিহাসকে তুচ্ছ করার শামিল। আধুনিক বিশ্বে যেখানে যোগ্যতা লিঙ্গ দিয়ে বিচার করা হয় না, সেখানে জামায়াত আমিরের এমন ব্যাখ্যা অত্যন্ত সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দেয়।
নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের প্রশ্নেও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে জামায়াতের এই অনাগ্রহ ফুটে ওঠে। সাক্ষাৎকারে যখন জানতে চাওয়া হয়, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত কেন একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি, তখন ডা. শফিক কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি কেবল বলেন, “আমরা সে জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।” বছরের পর বছর ধরে রাজনীতি করার পরও একটি দল কেন একজন নারী প্রার্থীও খুঁজে পায় না, তা বড় রহস্যের বিষয়। তিনি দাবি করেছেন যে এটি বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক বিষয় এবং অন্য দলেও নারী প্রার্থী অনেক কম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বড় দলগুলোতে সরাসরি ভোটে নারী প্রার্থীরা লড়ছেন এবং জয়ী হচ্ছেন। জামায়াতের এই ‘প্রস্তুতি’ নেওয়ার অজুহাত আসলে নারীর রাজনৈতিক অধিকারকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
আমিরের বক্তব্যে আরেকটি বিতর্কিত অংশ ছিল কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, একজন মা যখন সন্তান পালন করেন, তখন তাঁর জন্য পুরুষদের মতো সমান সময় কাজ করা ‘ইনসাফ’ নয়। তিনি বলেন, “দুগ্ধদানকালীন সময়ে তাদের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত।” আপাতদৃষ্টিতে একে মানবিক মনে হতে পারে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাব ভয়াবহ। ডা. শফিফের এই প্রস্তাব যদি কার্যকর হয়, তবে মালিকপক্ষ নারী শ্রমিক নিয়োগে নিরুৎসাহিত হবে। এতে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে। জামায়াত আমির দাবি করেছেন, তিনি কিছু কারখানা পরিদর্শন করে দেখেছেন নারীরা এতে খুশি। অথচ শ্রম অধিকার কর্মীরা মনে করছেন, এটি নারীকে পুনরায় গৃহবন্দী করার একটি পরোক্ষ প্রক্রিয়া।
ইসলামী আইন বা শরিয়াহ শাসন প্রবর্তন নিয়ে আমিরের অবস্থান ছিল ধোঁয়াশাপূর্ণ। তাঁর দলের নায়েবে আমির যখন জনসভায় বলেন যে সংসদে মানুষের তৈরি আইনের কোনো স্থান থাকবে না, তখন ডা. শফিক সেই বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেননি। তিনি কেবল বলেছেন, “দলের আমিরের বক্তব্যই চূড়ান্ত।” তিনি আরও বলেন, “যদি দেশের মঙ্গলের জন্য প্রয়োজনীয় হয়, তবে সংসদ এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আসলে বলটি জনগণের কোর্টে ঠেলে দিয়ে নিজের দলের আসল উদ্দেশ্যকে আড়াল করতে চেয়েছেন। সংসদ যদি কোনোদিন শরিয়াহ আইনের পক্ষে মত দেয়, তবে জামায়াত যে তা সানন্দে গ্রহণ করবে—এই ইঙ্গিত আমিরের কথায় স্পষ্ট।
ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্যগুলো পরিষ্কার করে দেয়, জামায়াতে ইসলামী তাদের পুরনো গোঁড়া দর্শন থেকে এক চুলও সরেনি। তারা মুখে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বললেও অন্তরে লালন করেন নারীবিদ্বেষ ও কর্তৃত্ববাদ। যে দল দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে কেবল তাদের শারীরিক গঠনের দোহাই দিয়ে অযোগ্য মনে করে, সেই দলের হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কখনোই নিরাপদ হতে পারে না।


