কক্সবাজারের চকরিয়ায় আরফা খাতুন (৭৫) নামে এক বৃদ্ধাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার নিজের ছেলে, দুই পুত্রবধূ ও গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে।
মেয়েকে ৬৫ কড়া জমি হেবা করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
চকরিয়া পৌরসভার সবুজবাগ আবাসিক এলাকার হাফেজ টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় ছেলের বাসায় গত বছরের ১০ নভেম্বর বিকেল ৩টা থেকে পরদিন সকাল ৬টার মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘটনার প্রায় চার মাস পর আদালতে মামলা হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
নিহতের নাতি মো. পারভেজ উদ্দিন বাবু (২৯) গত ১৬ মার্চ চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন। এতে চারজনের নাম উল্লেখ করে আরও তিন থেকে চারজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন নিহতের ছোট ছেলে আবদুল আজিজ (৩৫), তার স্ত্রী আকলিমা জান্নাত (২৬), নিহতের অপর ছেলে শামসুল আলমের স্ত্রী নাছরিন সোলতানা মুন্না (২৮) এবং গৃহকর্মী জয়নাব বেগম (২২)।
মামলার বাদী পারভেজ উদ্দিনের অভিযোগ, আরফা খাতুন তার নিজের নামে থাকা ৬৫ কড়া জমি মেয়ে লায়লা বেগমের নামে এককভাবে হেবা করে দেন। এতে তার ছেলে ও দুই পুত্রবধূ ক্ষুব্ধ হন। পরে কৌশলে আরফা খাতুনকে ছেলের বাসায় বেড়াতে নিয়ে কয়েকজন মিলে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ছুরিকাঘাতে হত্যার পর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রচার করা হয়। পরে দ্রুত মরদেহ গ্রামের বাড়ি চকরিয়ার চিরিঙ্গা ইউনিয়নের সওদাগরঘোনায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে তখন কোনো মামলা, সাধারণ ডায়েরি বা লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। ফলে একপর্যায়ে ঘটনাটি চাপা পড়ে যায় বলে মামলার বাদীর অভিযোগ।
নানির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখেন নাতি পারভেজ উদ্দিন। পরে তিনি আদালতে হত্যা মামলা করেন।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক বলেন, আদালত ফৌজদারি নালিশি মামলাটি আমলে নিয়ে ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে চকরিয়া থানাকে নির্দেশ দেন। পরে পুলিশ আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে জানায়, আরফা খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় ওই সময় চকরিয়া থানায় কোনো মামলা, জিডি বা লিখিত অভিযোগ করা হয়নি।
মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ২৩ জুলাই চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মুহাম্মদ ফারহান সাদিক মামলাটি পুনরায় তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে কক্সবাজার পিবিআইয়ের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। তদন্তে আসামিদের সম্পৃক্ততা প্রতীয়মান হলে তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেন আদালত।
পরে মামলার তদন্তভার পান কক্সবাজার পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) রাজীব পোদ্দার।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুকের দাবি, তদন্তে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এজাহারভুক্ত আসামিদের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
এর ধারাবাহিকতায় গত ১ সেপ্টেম্বর চার আসামির মধ্যে নাছরিন সোলতানা মুন্না, জয়নাব বেগম ও আবদুল আজিজকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তিনজনকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
একই দিন মামলার দুই সাক্ষী নিহতের মেয়ে জান্নাত আরা বেগম ও নিহতের ভাতিজার স্ত্রী হামিদা বেগম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। বাদীপক্ষের দাবি, তাদের জবানবন্দিতে সম্পত্তির জন্য আরফা খাতুনকে হত্যার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রাজীব পোদ্দার বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এজাহারভুক্ত চার আসামিরই আরফা খাতুন হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার সত্যতা পাওয়া গেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, চার আসামির মধ্যে আকলিমা জান্নাত পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।
মামলার অধিকতর তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তার তিন আসামির বিরুদ্ধে গত ২ সেপ্টেম্বর চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।


