‘নানা, আমি আর ১৫ মিনিটের মধ্যে খোকসা বাসস্ট্যান্ডে চলে আসতেছি’, মুঠোফোনে নানাকে আশ্বস্ত করেছিলেন নাবিল। কথা ছিল নানাবাড়িতেই এবার ঈদ করবেন। তবে সে আকাঙ্ক্ষা মুহূর্তেই রূপ নেয় বিষাদে। নাবিল ফিরলেন ঠিকই, কিন্তু লাশ হয়ে।
শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের কুটিপাড়া এলাকার আঞ্চলিক মহাসড়কে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় নাবিলের প্রাণ। তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আরও তিনজন, আহত হন আরও অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন।
নাতির সঙ্গে ফোনে কথা বলার ঠিক এক ঘণ্টা পর নানা পিয়ার আলী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছান নাবিলকে বাড়ি নিয়ে যেতে। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে পৌঁছান হাসপাতালে। করিডোরে প্রিয় নাতির নিথর দেহ দেখে বারবার মূর্ছা যান বৃদ্ধ পিয়ার আলী। তার কান্নায় ভারী হয়ে উঠে হাসপাতালের বাতাস।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর সদর উপজেলার মুন্সীবাজার এলাকার জুনায়েদের ছেলে নাবিল। বাবা ছোটখাটো ব্যবসা করেন। মা অনেক কষ্ট করে ছেলেকে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন। মায়ের স্বপ্ন ছিল- ছেলে পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকরি করবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু একটি বেপরোয়া ডাম্প ট্রাকের ধাক্কা মুহূর্তে ওলটপালট করে দিল সব স্বপ্ন।
পিয়ার আলী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি বললাম তুমি এখানে চলে আসো। ও ঈদ করতে আমার বাড়িতে আসছিল। আমি শুক্রবার আসতে বলেছিলাম, কিন্তু নাতি বলল জামাকাপড় কিনে শনিবার আসবে। সকাল সাড়ে ৮টায় ফোন করলাম, বলল রওনা হয়েছে। সাড়ে ৯টায় বলল আর ১৫ মিনিট লাগবে। সাড়ে ১০টার পর থেকে ফোন বন্ধ।’
‘ভেবেছিলাম চার্জ নেই, কিন্তু মন মানছিল না। বাসস্ট্যান্ডে এসে শুনি গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে। হাসপাতালে এসে দেখি ও মরে পড়ে আছে’, বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের নানা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, রাজবাড়ী থেকে কুষ্টিয়াগামী আনুমানিক ৫০ জন যাত্রী বোঝাই একটি যাত্রীবাহী বাসকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী জিলাপিতলা এলাকা থেকে আসা একটি দ্রুতগামী ডাম্প ট্রাক ধাক্কা দেয়। এতে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের একটি পুকুরে উল্টে পড়ে।
খবর পেয়ে স্থানীয় জনগণ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। বাস থেকে যাত্রীদের উদ্ধার করে খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাবিলসহ দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত অন্যজনের বয়স আনুমানিক ৬০ বছর, তার পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
পরে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে একজন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর এলাকার রফিয়া (১৭) এবং অন্যজন আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি। এ নিয়ে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ জনে।
খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জানান, আহতদের মধ্যে ১১ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকিরা খোকসায় চিকিৎসাধীন আছেন।
কুষ্টিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবায়েদ জানান, বিপরীত দিক থেকে আসা ডাম্প ট্রাকের ধাক্কাতেই বাসটি ডোবায় উল্টে যায়।
খোকসা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানিয়েছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।


