দেড় বছরের অস্থিরতা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং বিদায় বেলায় নিয়োগ-পদোন্নতি বিতর্ক মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান।
রোববার সকালে তিনি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের কাছে ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করেন। পদত্যাগপত্রে নিয়াজ আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতির কাছে তার মূল পদ–উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের গ্রেড-১ অধ্যাপক হিসেবে ফিরে যাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
উপাচার্যের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার প্রটোকল অফিসার মোহাম্মদ ফিরোজ শাহ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ পান নিয়াজ আহমেদ। প্রায় দেড় বছর পর গত ১০ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রথম পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল এবং একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা যেন নিজেদের মতো করে প্রশাসন সাজাতে পারে, সেই সুযোগ করে দিতেই তিনি সরে দাঁড়াতে চান। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করলেন।
নিয়াজ আহমেদের দায়িত্বকালীন দেড় বছর ছিল নানা বিতর্কে ঘেরা। নিয়োগের শুরুতেই তিনি জামায়াতে ইসলামীর অনুসারী বলে বিভিন্ন মহল থেকে বিতর্ক তোলা হয়। তার সময়কালেই অনুষ্ঠিত হয় ডাকসু নির্বাচন, যে নির্বাচনে জয়ী হয় ইসলামী ছাত্রশিবির। সেই নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি ছাত্র সংগঠনের প্রতি পক্ষপাত করেছে বলে অভিযোগ তোলে কয়েকটি ছাত্র সংগঠন।
উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেন নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীকালে এই মামলায় ২১ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল এবং কয়েকজনকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়।
তোফাজ্জল হত্যার আট মাস পর ২০২৫ সালের ১৩ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য। এ ঘটনার পর ক্যাম্পাসজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং ছাত্রদল ও বাম ছাত্র সংগঠনগুলো উপাচার্য ও প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করে। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে নিয়াজ আহমেদের পক্ষে ছিল শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। তারা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে সিসিটিভি বাড়ানো, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ ও যৌথ অভিযানের দাবি জানায়।
নভেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির কর্মচারী মোস্তফা আসিফ অর্ণব এক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথমে মামলা করেও তা প্রত্যাহার করে নেয়। প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ জানান, ‘তৌহিদী জনতার’ চাপে সেই মামলা প্রত্যাহার করতে তারা বাধ্য হয়েছেন।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৬ জুন যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি পুনর্গঠন করা হলেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, এই সেল ও তদন্ত কমিটি কার্যকর নয় এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন দাবি করেছে, অভিযোগ বক্স ও ই-মেইলসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে তারা পুরোনো ও নতুন অভিযোগগুলো তদন্ত করছে এবং নীতিমালার কাজ চলছে।
শিক্ষায় বিশ্বমানের র্যাংকিং নিয়েও অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদের মেয়াদে বিতর্ক তৈরি হয়। কিউএস র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ২০২৪ সালের ৫৫৪তম থেকে ২০২৫ সালে ৫৮৪তম স্থানে নেমে আসে। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ অভিযোগ করেন যে, প্রশাসন এই তথ্য গোপন করে বিভিন্ন ব্রিফিংয়ে অগ্রগতির মিথ্যা দাবি করেছে।
তবে টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে কিছুটা উন্নতি দেখা যায়, যেখানে অবস্থান ১০০১-১২০০ থেকে ৮০১-১০০০ এর মধ্যে উঠে আসে। উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালে এই অবস্থান ছিল ৬০১-৮০০ এর মধ্যে। এ ছাড়া ২০২২ সালে সিন্ডিকেটে চূড়ান্ত হওয়া শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়ার কথা থাকলেও নিয়াজ আহমেদের আমলে তা বাস্তবায়িত হয়নি। রেজিস্ট্রারের তথ্যমতে, এটি নিয়ে ডিনস কমিটিতে আলোচনার কথা থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
উপাচার্যের বিদায়বেলায় সবচেয়ে বড় বিতর্কটি তৈরি হয় কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী বছরে সর্বোচ্চ ২১ জনকে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ থাকলেও অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ একসঙ্গে ২০৭ জনকে পদোন্নতির উদ্যোগ নেন। একে ‘বিধি লঙ্ঘন’ ও ‘নজিরবিহীন’ সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করে বঞ্চিত কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, যোগ্যদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান জানান, এটি একটি বিশেষ ‘সাধারণ সিদ্ধান্ত’ যা সরকারের অন্যান্য দপ্তরের আদলে একবারের জন্য নেওয়া হয়েছে। বঞ্চিতদের তালিকা কারিগরি কমিটি যাচাই করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রাখা, ডাকসু নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে আলোচনা এবং ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাগুলোতেও তার প্রশাসন বারবার বিতর্কের মুখে পড়েছে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগও ছিল প্রবল।
মূলত এসব বহুমুখী সংকট ও বিতর্কের অবসান ঘটাতেই নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নিয়াজ আহমেদ খান তার পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন।


