বিশ্বকাপ ফুটবলের মহাযজ্ঞে ফুটবলারদের পায়ের জাদুতে বুঁদ হতে প্রস্তুত কোটি কোটি দর্শক। এবারের আসরকে সামনে রেখে টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড় হতে পারেন এমন একঝাঁক উদীয়মান তারকার তালিকা প্রকাশ করেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ধারণা করা হচ্ছে, এই ১৫ জন তরুণ ফুটবলারের মধ্য থেকেই কেউ একজন জিতে নেবেন এবারের আসরের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। আসুন দেখে নেই সেই তরুণ তারকাদের।
লামিন ইয়ামাল (স্পেন)
গত তিন বছর ধরে বার্সেলোনা এবং স্পেন জাতীয় দলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে খেললেও লামিন ইয়ামালের বয়স যে এখনও মাত্র ১৮ বছর, তা অনেকেই ভুলে যান। কাতালানদের হয়ে ৪৫ ম্যাচে ৪২টি গোলে অবদান রেখে আরেকটি ঝলমলে মৌসুম শেষ করে বিশ্বকাপে এসেছেন এই উইঙ্গার। স্বভাবতই ফুটবল বিশ্বের কোটি চোখ আরও একবার এই বিষ্ময় বালকের ওপর নিবদ্ধ থাকবে।

দেজিরে দুয়ে (ফ্রান্স)
গত সপ্তাহেই ২১ বছরে পা রাখা দেজিরে দুয়ে ইতিমধ্যেই ফরাসি ফুটবলে নিজের জাত চিনিয়েছেন। ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে (পিএসজি) যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি দুটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপসহ ফ্রান্সের ঘরোয়া সব প্রধান শিরোপা জিতেছেন। গত মৌসুমে ফরাসি এই উইঙ্গার পিএসজির হয়ে ২৪টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন। ফরাসিদের ঐতিহ্যবাহী নীল জার্সিতে এই বিশ্বকাপে দারুণ একটি অভিযান তাকে বিশ্বের এলিট ফুটবলারদের কাতারে পাকাপাকিভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

জোয়াও নেভেস (পর্তুগাল)
দেজিরে দুয়ের মতোই ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে ফরাসি ক্লাব পিএসজিতে নাম লেখান পর্তুগিজ মিডফিল্ডার জোয়াও নেভেস। বেনফিকার একাডেমি থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার দ্রুতই পিএসজির মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হন। মাঠে অক্লান্ত পরিশ্রম, ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা এবং বলের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। পর্তুগাল যদি উত্তর আমেরিকার এই আসরে ভালো পারফর্ম করে, তবে সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কারের দৌড়ে নেভেস বেশ ভালোভাবেই থাকবেন।

এন্ড্রিক (ব্রাজিল)
রিয়াল মাদ্রিদে ক্যারিয়ারের শুরুটা কিছুটা কঠিন হলেও ১৯ বছর বয়সী এন্ড্রিক গত মৌসুমের দ্বিতীয় ভাগে অলিম্পিক লিঁওতে ধারে খেলতে গিয়ে নিজের অবিশ্বাস্য প্রতিভা দেখিয়েছেন। ফরাসি এই ক্লাবের হয়ে মাত্র ২৪ ম্যাচে ১৬টি গোলে অবদান রেখে তিনি দলের অপরিহার্য সদস্যে পরিণত হন। এবার ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সি গায়ে সেই চেনা ফর্ম বিশ্বকাপে ধরে রাখাই হবে এই তরুণ তুর্কির মূল লক্ষ্য।

পাউ কুবারসি (স্পেন)
মাত্র ১৭ বছর বয়সেই বার্সেলোনার সাবেক কোচ জাভি হার্নান্দেজের অধীনে ক্লাবের রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন পাউ কুবারসি। স্পেনের বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও তার শুরুর একাদশে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কোনো ডিফেন্ডার কখনো সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার পাননি, তবে উত্তর আমেরিকার মাঠে কুবারসি আলো ছড়াতে পারলে সেই ইতিহাস নতুন করে লেখা হতেই পারে।

ওয়ারেন জাইর-এমেরি (ফ্রান্স)
ফিফার এই তালিকায় থাকা পিএসজির তৃতীয় খেলোয়াড় হলেন ওয়ারেন জাইর-এমেরি। ক্লাব ফুটবলে আরেকটি সফল ও শিরোপায় ঠাসা মৌসুম পার করে তিনি বিশ্বকাপে এসেছেন। তবে এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মিডফিল্ডারের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতার সম্ভাবনা অনেকটাই নির্ভর করছে তিনি তারকাখচিত ফরাসি দলে শুরুর একাদশে জায়গা করে নিতে পারেন নাকি ‘সুপার সাব’ হিসেবে ভূমিকা রেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তার ওপর।

আরদা গুলের (তুরস্ক)
রিয়াল মাদ্রিদে থিতু হতে কিছুটা সময় লাগলেও গত মৌসুমে এই আক্রমণাত্মক ফুটবল জাদুকরের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে যায়। ২০টি গোলে অবদান রাখা এবং মাঠে সৃজনশীলতার কারণে গুলের এখন স্প্যানিশ জায়ান্টদের শুরুর একাদশের নিয়মিত খেলোয়াড়। উত্তর আমেরিকার মাঠে কেনান ইলদিজের পাশাপাশি গুলেরই হবেন তুরস্কের অন্যতম বড় আশার আলো।

আন্তোনিও নুসা (নরওয়ে)
নরওয়ের জাতীয় দলের হয়ে আন্তোনিও নুসার পারফরম্যান্স তাকে এই পুরস্কারের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এ পর্যন্ত ২৪ ম্যাচে ১৭টি গোলে অবদান রাখা এই তরুণ বাঁ-উইঙ্গারের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়। এবারের বিশ্বকাপে নরওয়ে যদি চমক সৃষ্টি করতে চায়, তবে তাতে নুসার বড় ভূমিকা থাকবে।

ইয়ান দিওমান্দে (আইভরি কোস্ট)
নুসার লিপজিগ সতীর্থ ইয়ান দিওমান্দে গত মৌসুমে ২৩টি গোলে অবদান রেখে উল্কার গতিতে ওপরে উঠে এসেছেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি আইভরি কোস্টের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখেন। মাঠে তার গতি এবং দুই পায়ে সমানভাবে বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য তাকে পড়া কঠিন করে তোলে।

ইব্রাহিম মাজা (আলজেরিয়া)
বায়ার লেভারকুসেনের হয়ে অভিষেক মৌসুমের দ্বিতীয় ভাগেই প্রথম একাদশে জায়গা পাকা করেন এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। ২০২৪ সাল থেকে তিনি আলজেরিয়া জাতীয় দলেরও নিয়মিত মুখ। আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের মতো কঠিন গ্রুপে পড়া উত্তর আফ্রিকার এই দলটিকে যদি নকআউট পর্বে যেতে হয়, তবে মাজার সৃজনশীলতার ওপর তাদের অনেকখানি নির্ভর করতে হবে।

নিকো ও’রেইলি (ইংল্যান্ড)
ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা নিকো ও’রেইলিকে একজন অ্যাটাকিং প্লেমেকার থেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাকে রূপান্তরিত করেছেন। ম্যানচেস্টারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ফুটবলার টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড দলেও নিয়মিত সুযোগ পেতে পারেন। বহুমুখী খেলার যোগ্যতা, প্রতিপক্ষের প্রেসিংয়ের মুখে শান্ত থাকা এবং বলের ওপর চমৎকার নিয়ন্ত্রণের কারণে সিটির হয়ে আরেকটি দারুণ মৌসুম কাটানো ও’রেইলি এবার বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম চেনাতে মরিয়া।

কেন্দ্রি পায়েজ (ইকুয়েডর)
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইকুয়েডরের জাতীয় দলের হয়ে ২৫টিরও বেশি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে কেন্দ্রি পায়েজের। ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে চেলসি তার দলবদল নিশ্চিত করে। মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও তার বহুমুখী প্রতিভার কারণে কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেচে প্রতিপক্ষ বুঝে তাকে আক্রমণের যেকোনো পজিশনে ব্যবহার করতে পারেন।

গিলবার্তো মোরা (মেক্সিকো)
মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় ধরা হচ্ছে গিলবার্তো মোরাকে। এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার গত মৌসুমে ক্লাব তিহুয়ানার হয়ে ২০ ম্যাচে ৭টি গোলে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। ঘরের মাঠের এই বিশ্বকাপে বিশ্বমঞ্চে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে মুখিয়ে আছেন মোরা।

নিকো পাজ (আর্জেন্টিনা)
তেনেরীফেতে জন্ম নেওয়া এই আর্জেন্টাইন তরুণ রিয়াল মাদ্রিদের যুব একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন। ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে তিনি যোগ দেন ইতালিয়ান সিরি-আ’র ক্লাব কোমোতে। সেস ফ্যাব্রিগাসের অধীনে দ্রুতই বিশ্বের অন্যতম তরুণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন। পাজের অসামান্য টেকনিক এবং মাঠের খেলা বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার মিশনে তাকে একজন গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি করে তুলতে পারে।

কেনান ইলদিজ (তুরস্ক)
তুর্কি আক্রমণে আরদা গুলেরের যোগ্য সঙ্গী কেনান ইলদিজ ইতিমধ্যেই দেশের হয়ে ২৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। ২০২৩ সাল থেকে কোচ ভিনসেনজো মন্তেল্লার দলে তিনি নিয়মিত খেলছেন। দুই পায়ে সমান পারদর্শী এই প্লেমেকার গত মৌসুমে জুভেন্টাসের হয়ে মোট ২১টি গোলে অবদান রেখেছেন এবং এবার বিশ্বকাপেও নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে চান।

লুকা ভুশকোভিচ (ক্রোয়েশিয়া)
টটেনহ্যাম হটস্পারের এই রক্ষণভাগের রত্ন গত মৌসুম ধারে হামবুর্গে কাটিয়েছেন। জার্মান শীর্ষ লিগে ক্লাবটির ফেরা নিশ্চিতের পর তাদের বুন্দেসলিগায় টিকে থাকতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন তিনি। গ্রুপ ‘এল’-এ ২০১৮ সালের রানার্স-আপ ক্রোয়েশিয়া যখন ইংল্যান্ড, ঘানা ও পানামার মুখোমুখি হবে, তখন উত্তর আমেরিকার মাঠে ভুশকোভিচই হবেন ক্রোয়াটদের রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা।



