বৈশ্বিক আবহাওয়ায় তৈরি হচ্ছে শক্তিশালী এল নিনো। ইতিহাস যদি কোনো নির্দেশিকা হয়, তবে এর আঘাত হতে পারে অত্যন্ত মারাত্মক। এমন খবর প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস।
গবেষকদের মতে, অতীতের সবচেয়ে বড় এল নিনোর ঘটনাগুলো মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। আর বর্তমানে যে এল নিনোটি তৈরি হচ্ছে, সেটিকে ইতিহাসের সেই ভয়াবহ সময়গুলোর সাথে তুলনা করা হচ্ছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাস এবং পানির তাপমাত্রার শক্তিশালী পরিবর্তনকে মূলত এল নিনো বলা হয়। এই পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরণকে ব্যাপকভাবে বদলে দিতে পারে। গত কয়েক শতাব্দী ধরে এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীতে ভয়াবহ খরা এবং তীব্র তাপদাহ তৈরি হয়েছে। এমনকি এর ফলে বিভিন্ন মহামারীর প্রকোপও অনেক বেড়ে গিয়েছিল।
মানবজাতি এই আবহাওয়া চক্রটিকে পুরোপুরি বোঝার অনেক আগে থেকেই এল নিনো তার প্রভাব রেখে আসছিল। কিছু শিক্ষাবিদ দাবি করেন, প্রাচীন মিশরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে এল নিনোর প্রভাব ছিল। এমনকি এক হাজার বছরেরও বেশি আগে বর্তমান পেরুর মোচে সভ্যতার পতনের পেছনেও এর হাত ছিল।
এছাড়া ১৮৭৭ এবং ১৮৭৮ সালের দিকে এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট একটি দুর্ভিক্ষে ক্রান্তীয় অঞ্চলজুড়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এই দুর্যোগ বিশ্বজুড়ে এমন এক বৈষম্য তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে ‘প্রথম বিশ্ব’ এবং ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামে পরিচিতি পায়।
বর্তমানে পৃথিবী আবার একটি নতুন এল নিনো পর্যায়ে প্রবেশ করছে। গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে। প্রাকৃতিক শক্তি যখন তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তা কতটা অস্থিরতা ও কষ্ট ডেকে আনতে পারে, তা মনে করিয়ে দিতেই বিশেষজ্ঞরা অতীতের ইতিহাস তুলে ধরছেন।
সাধারণত এল নিনোর কারণে আমেরিকার কিছু অংশে বৃষ্টিপাত বেশি হয় এবং আটলান্টিক মহাসাগরের হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড় মওসুম স্তিমিত হয়ে পড়ে। তবে এই একই আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় খরার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
অবশ্য বর্তমান এল নিনোটি এখনও গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই এটি আশঙ্কার চেয়ে কিছুটা কম শক্তিশালীও হতে পারে। তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস যদি সত্যি হয়, তবে এটি একটি বিশাল আকার ধারণ করবে। বর্তমান বিশ্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সচেতন হলেও, নতুন কিছু দুর্বলতার কারণে এর পরিণতি সবাইকে ভোগ করতে হবে।
অতীতের তুলনায় বর্তমান যুগের দেশগুলো সমুদ্রের পরিমাপক যন্ত্র এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে এল নিনোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত। খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে থাকা অনেক দেশেই এখন জরুরি খাদ্য বা শস্য মজুত থাকে। তাই বিশেষজ্ঞরা এবার বড় ধরনের কোনো দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছেন না।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই এল নিনো বর্তমানের ভঙ্গুর বিশ্ব ব্যবস্থার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সার সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। ইউক্রেন এবং ইরানের যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বাড়ছে, যা বিভিন্ন দেশের বাজেটে টান ফেলছে। অন্যদিকে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের বৈদেশিক সাহায্য কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ব্রিটেনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান লরি লেবোর্ন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সব মিলিয়ে একটি চরম সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা, সংঘাত এবং ঋণের বোঝা বেড়ে যেতে পারে। আর এর একটির প্রভাবে একের পর এক অন্য সংকটগুলো তৈরি হবে।
ইতিহাস থেকে যদি কোনো শিক্ষা নেওয়ার থাকে, তবে তা হলো ১৮৭৭ সালের মতো শক্তিশালী এল নিনো সমাজের বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সে সময়কার এল নিনোর কারণে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং চীনসহ পুরো বিশ্বে মারাত্মক খরা দেখা দিয়েছিল।
তবে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের মতো এত কঠিন আঘাত আর কোথাও লাগেনি। সমসাময়িক বিবরণ থেকে জানা যায়, সে সময় মানুষ কঙ্কালসার দেহে শিকড় খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল। এমনকি অভাবের তাড়নায় অনেকে নিজেদের সন্তানকেও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের পাশাপাশি মানুষের তৈরি কিছু কারণও সে সময় মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দেয়। তখন ওই অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। সে সময় ভারত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। ইতিহাসবিদ মাইক ডেভিস তার ২০০১ সালের একটি বইয়ে উল্লেখ করেন, ভারতীয়রা যখন না খেয়ে মরছিল, তখনও ব্রিটেন ভারতের বিপুল পরিমাণ শস্য রপ্তানি অব্যাহত রেখে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। তিনি লিখেছেন, লন্ডনের বাসিন্দারা আসলে ভারতের ক্ষুধার্ত মানুষের খাবার খাচ্ছিল।
অবশ্য পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণও ছিল। সে সময় মানুষ জানত না যে কেন বর্ষায় ঠিকমতো বৃষ্টিপাত হয়নি। উনিশ শতকের বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন, সূর্যের ভেতরের কিছু পরিবর্তনের সাথে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে ১৯৬০-এর দশকে এ বিষয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ জ্যাকব জের্কনেস প্রশান্ত মহাসাগরের পানি এবং বায়ুমণ্ডলের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের বৈশ্বিক প্রভাবগুলো বিশ্লেষণ করেন। এরও কয়েক শতাব্দী আগে পেরুর জেলেরা লক্ষ্য করেছিলেন যে, বড়দিনের কাছাকাছি সময়ে তাদের উপকূলে হঠাৎ প্রচুর গ্রীষ্মমন্ডলীয় মাছ চলে আসে। এ ঘটনাকে তারা নাম দিয়েছিলেন ‘এল নিনো’, যার স্প্যানিশ অর্থ ‘শিশু যীশু’। ড. জের্কনেস এই দুই বিষয়ের সংযোগ স্থাপন করেন। তিনি প্রমাণ করেন, পেরুর উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের এই উষ্ণতাই আসলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরণ বদলে দিচ্ছে।
আমেরিকান আবহাওয়া সংস্থার বিজ্ঞানী মাইকেল ম্যাকফ্যাডেন বলেন, এই আবিষ্কারটি ছিল আবহাওয়া বিজ্ঞানের জন্য একটি বিশাল মাইলফলক। এটি গবেষণার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল।
১৯৮০-এর দশকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে জাহাজে করে গিয়ে বিশেষ বয়া স্থাপন করেন। এর ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি গবেষকরা গাছের বার্ষিক রিং বা বলয়, প্রবাল প্রাচীর এবং প্রাচীন নাবিকদের লগবই পরীক্ষা করে মানব ইতিহাসে এল নিনোর প্রভাব খোঁজার চেষ্টা করেন। তারা এল নিনোর অতীতের একটি খসড়া সময়রেখাও তৈরি করেন।
তখন অতীতের ঘটনাগুলো নিখুঁতভাবে পরিমাপ করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। তবে এগুলো থেকে ধারণা করা হয়, ১৭০০ সালের শেষের দিকে একটি এল নিনোর কারণে ফ্রান্সে ফসলহানি হয়েছিল, যা ফরাসি বিপ্লবের গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখে।
১৮৭৭ সালের যে এল নিনো ভারতে আঘাত হানে, সেটির তথ্য কিছুটা ভালো হলেও তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে গবেষণাকারী এক বিজ্ঞানী জানান, উনিশ শতকের সমুদ্রের তাপমাত্রার উপাত্ত নিয়ে কাজ করাটা অনেকগুলো হারিয়ে যাওয়া টুকরো দিয়ে একটি ধাঁধা মেলানোর মতো কঠিন।
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চলের একটি বিশাল এলাকার তাপমাত্রার মাত্রা দেখে এল নিনোর তীব্রতা মাপা হয়। একটি মাঝারি ধরনের এল নিনোতে তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদী গড়ের চেয়ে এক ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিন্তু গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় এল নিনোগুলোতে—যেমন ১৯৮২, ১৯৯৭ এবং ২০১৫ সালে—তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়েছিল। এই প্রতিটি ব্যবস্থাপনাই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি করেছিল।
এ বছর অনেক পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, তাপমাত্রা অভূতপূর্বভাবে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এমনকি ১৮৭৭ সালের এল নিনোতেও তাপমাত্রা এতটা বাড়েনি। আবহাওয়া বিজ্ঞানী জেকে হাউসফাদার বলেন, বেশ কয়েকটি মডেল এবার একটি রেকর্ড সৃষ্টিকারী এল নিনোর সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তবে নিশ্চিতভাবে জানার জন্য এখনও কিছুটা সময় লাগবে।
এল নিনোর তীব্রতা সাধারণত বছরের শেষের দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর পরবর্তী মাসগুলোতে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে অনেক বিজ্ঞানী ধারণা করছেন, ২০২৭ সালটি ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে পারে।
ভারতে এল নিনোর সময়ে সাধারণত কম বৃষ্টিপাত হয়। তাই দেশটির সরকার ইতিমধ্যে প্রস্তুতিমূলক বৈঠক শুরু করেছে। তবে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক বিমল মিশ্র বলেছেন, এক শতাব্দী আগের মতো এবার আর দেশটিতে অত বড় ঝুঁকির আশঙ্কা নেই। ভারতের সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার কারণে এখন আর এক বছর খরা হলে দুর্ভিক্ষ হবে না। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষ কম দামে মৌলিক খাদ্যসামগ্রী পেয়ে থাকে।
তবে বিমল মিশ্র সতর্ক করে বলেছেন, ভারতের মতো অন্যান্য দেশ এখনও ঝুঁকির বাইরে নয়। বৃষ্টিপাত খুব কম হলে মানুষ তাদের সঞ্চয় ভাঙতে শুরু করবে এবং খরচ কমিয়ে দেবে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থিমিত হয়ে পড়বে। খরার সময়ে স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হারও বেড়ে যায়। এটি সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিমল মিশ্র ভারতের অতীতের বড় দুর্ভিক্ষগুলো নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি ১৮৭০-এর দশকের সেই দুর্ভিক্ষ এবং ভারতের বর্তমান প্রস্তুতির মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক দেখতে পান। তিনি বলেন, অতীতের সেই ঘটনা আমাদের শেখায় কীভাবে আরও ভালো প্রস্তুতি নেওয়া যায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।


