দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিতে চলতি এপ্রিল মাসে এক মিশ্র কিন্তু গভীর উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সহিংসতা কিছুটা কমলেও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনা।
সেই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বৃহস্পতিবার এমএসএফ’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং নিজস্ব উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে দেশে ৪৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় তিনজন নিহত এবং ৩০৩ জন আহত হয়েছেন। যদিও মার্চের তুলনায় হতাহতের সংখ্যা কমেছে, তবে আধিপত্য বিস্তার ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল কেন্দ্রিক সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া দুর্বৃত্তদের হামলায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে ২১ জন নিহত হয়েছেন, যা আইনের শাসনের দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও হেফাজতে মৃত্যু
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এপ্রিল মাসে মাগুরার মহম্মদপুরে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চকরিয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ একাধিক নারীকে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পিরোজপুরে ডিবির হেফাজতে এক ব্যক্তিকে বৈদ্যুতিক শক ও অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ধরনের ঘটনায় জবাবদিহিতার অভাব নাগরিক জীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গণমাধ্যমের ওপর চাপ ও সাইবার আইন
সাংবাদিকদের জন্য এপ্রিল মাসটি ছিল চরম প্রতিকূল। এ মাসে ৪৬ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। কুমিল্লা, ঢাকা ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সাংবাদিকদের হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে।
পাশাপাশি ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’ পাসের পর এর অপব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এ মাসে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মতপ্রকাশের জেরে ৪টি মামলায় অন্তত ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা
নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা এ মাসে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এমএসএফ-এর হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিলে ৩১২টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৫৪টি ধর্ষণ এবং ১৪টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে।
এ ছাড়া এ মাসে ১১ জন শিশু ও ১২ জন কিশোরীসহ মোট ৮৯ জন নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সংস্থাটি মনে করে, পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
সীমান্ত ও সংখ্যালঘু পরিস্থিতি
সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে এ মাসে একজন নিহত ও দুইজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া মাইন বিস্ফোরণ ও অপহরণের ঘটনায় সীমান্তবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ১০টি প্রতিমা ভাঙচুরসহ ৮টি নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এমএসএফ জোর দাবি জানিয়েছে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং নারী-শিশুসহ সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।


