বর্তমানে দেশে প্রায় ছয় সপ্তাহের জ্বালানি মজুত রয়েছে, যা ইউরোপীয় মানের সঙ্গে তুলনীয় বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জ্বালানির মজুত এখন ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা অন্তত মে মাস পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করবে। এপ্রিল ও মে মাসের চাহিদা মেটাতে সরকারের সক্ষমতা রয়েছে এবং জুন মাসের জন্যও পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে।’
শুক্রবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রামে দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি পরিদর্শন শেষে রিফাইনারির সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক ইউরোপীয় দেশের মতো বাংলাদেশও প্রায় ছয় সপ্তাহের জ্বালানি মজুত ধরে রাখতে পেরেছে। এখন জুন মাসের জন্যও সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।’
সরবরাহে চাপের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে দুটি অপরিশোধিত তেলের চালান আটকে রয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে, যদিও বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, ‘বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং আগামী মাসে চালানগুলো পৌঁছানোর কথা রয়েছে।’
ফেব্রুয়ারির শেষে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরস্থিতিতে অস্থিরতার প্রভাব মার্চ ও এপ্রিলের সরবরাহে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল প্রায় সব দেশই একই চাপের মুখে রয়েছে।’
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াতে দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা সরকার এগিয়ে নিচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী মাসে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং ২০২৯ সালে দ্বিতীয় ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই প্রকল্পটিকে দৃশ্যমান বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ইউনিট চালু হলে দেশে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং জ্বালানি তেলের উৎস বহুমুখীকরণ সহজ হবে।’
১৯৬৮ সালে যাত্রা শুরু করা ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বছরে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এই তেলের বড় অংশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহকে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর করে রেখেছে।’
‘মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশেই পরিশোধনের সুযোগ তৈরি হবে, এতে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা বা আঞ্চলিক সংকটের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে’, যোগ করেন অনিন্দ্য ইসলাম।
রিফাইনারির উৎপাদন পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো শরীফ হাসনাত বলেন, ‘বর্তমানে দুটি ইউনিটের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে, তবে পেট্রল ও বিটুমিন উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। এ মাসে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে।’
বিদ্যুৎ খাতে চলমান চাপ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট বেশি ছিল, আর লোডশেডিং ছিল প্রায় ৪৮১ মেগাওয়াট। চট্টগ্রাম শহরে রাত ৯টার দিকে বিভিন্ন এলাকায় সর্বোচ্চ ৩৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে।’
তিনি জানান, এই সংকটের মূল কারণ গ্যাস, কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি। বিশেষ করে প্রধান সরবরাহকারী দেশ কাতারের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের আমদানিকে প্রভাবিত করছে।
বোরো মৌসুমে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং কর্মসংস্থান রক্ষায় শিল্প উৎপাদন সচল রাখা নিশ্চিত করতে জ্বালানি সরবরাহের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে জানিয়ে অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, ‘এর ফলে গৃহস্থালি খাতে সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে, যা একটি পরিকল্পিত কৌশলগত সিদ্ধান্ত। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ইতোমধ্যে জ্বালানি কার্ড ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা বণ্টনে স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
পরিদর্শনে আরও উপস্থিত ছিলেন জ্বালানিসচিব মো. সাইফুল ইসলাম ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


