মুক্ত গণমাধ্যম, সুশাসন ও আইনের শাসনে এগিয়ে থাকা দেশগুলো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও গণতান্ত্রিক চর্চাতে সফল হলেও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ প্রায় সব আন্তর্জাতিক সূচকেই নিম্ন অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
শনিবার ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এ অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় প্লেনারি সেশনে দেশের রাজনৈতিক-শাসন কাঠামো, গণতন্ত্র ও স্বাধীন গণমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী যেসব দেশ মুক্ত গণমাধ্যম, সুশাসন ও আইনের শাসনের সূচকে এগিয়ে রয়েছে, সেগুলো একই সঙ্গে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও গণতান্ত্রিক চর্চাতেও সফল। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ প্রায় সব আন্তর্জাতিক সূচকেই নিম্ন অবস্থানে রয়েছে।’
‘প্রেস ফ্রিডমকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই’ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রতিফলন।’
‘দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে “উইনার টেকস অল” বা “জিরো-সাম” রাজনীতির প্রবণতা রয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক পরিসর একচেটিয়া হয়ে পড়ে এবং ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কাঠামো ও উপকরণ ব্যবহার করা হয়। প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করছে’, যোগ করেন তিনি।
‘পলিটিকো-গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেম অ্যান্ড ফ্রি মিডিয়া’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা বলেন, সংবাদমাধ্যম কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠান নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রতিফলনই গণমাধ্যমে দেখা যায়।
সেশনে মডারেটর ছিলেন ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন। আলোচক হিসেবে অংশ নেন পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস, দ্য ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ, বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার এবং দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মোহাম্মদ আলী।
পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি শুনে আমার মনে হয়েছে যেন পাকিস্তানের বাস্তবতাই তুলে ধরা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশ একই ধরনের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’
‘এ অঞ্চলের গণমাধ্যমগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের বিষয়গুলো প্রায়ই উপেক্ষা করে। রাজনৈতিক সংঘাত বা বড় শহরকেন্দ্রিক ঘটনাই বেশি গুরুত্ব পায়, ফলে সাধারণ মানুষের বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাস্তবতা ইউরোপের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার আগে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি’, যোগ করেন তিনি।
দ্য ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, ‘দেশে গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও বাস্তবে “অন্যের কণ্ঠস্বর” উপেক্ষিত হচ্ছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবের নেতিবাচক প্রভাব রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমেও পড়ছে।’
মিডিয়ার মালিকানা কাঠামো, রাজনৈতিক চাপ ও আত্মবিশ্বাসের সংকট তুলে ধরে কামাল আহমেদ বলেন, ‘মিডিয়া তখনই স্বাধীন থাকতে পারবে, যখন তারা আর্থিকভাবে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।’
প্রেস কাউন্সিলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে।’
আলোচনা সভায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার বলেন, ‘গণমাধ্যমকে নিজেদের কাজ আরও দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে করতে হবে। জনগণের আস্থা ও সমর্থনই হবে সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
‘জনগণের আস্থা ও সমর্থনই হবে সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও কার্যকর জন-প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সাংবাদিকদের পরিচয় হওয়া উচিত কেবল একজন সাংবাদিক হিসেবে, কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের প্রতিনিধির মতো নয়।’
রাজনৈতিক রিপোর্টিংয়ে তথ্য যাচাই, সংবিধান ও আইন বোঝার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সাংবাদিকদের শুধু দলীয় কর্মকাণ্ড নয়, রাষ্ট্র, আইন, সংসদীয় কার্যপ্রণালি ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান থাকতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কণ্ঠস্বর সংবাদমাধ্যমে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের ভেতরেও আদর্শিক বিভাজন বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।’


