তিস্তা অববাহিকা থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। স্পষ্ট হচ্ছে ক্ষতচিহ্ন। বিশেষ করে আশ্বিন মাসে আমন খেতে এখন শুধু পানি আর পানি। কচুরিপানায় ছেয়ে গেছে পুরো আবাদ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য মতে, তিস্তার পানিবৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারীর ডোমার, ডালিয়া, জলঢাকা, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, লালমনিরহাটের সদর, আদিতমারী, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালিগঞ্জ, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ি, ভুরুঙ্গামারী, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চল এবং নিম্মাঞ্চলের আমনের আবাদ এখনো পানির নিচে। এবারের বন্যায় প্রচুর পরিমাণে কচুরিপানা আসায় বেশি বিপদে পড়েছেন কৃষকরা। দ্রুত কচুরিপানা সরানো না হলে পুরো আবাদই নষ্ট হয়ে যাবে।
গঙ্গাচড়ার লক্ষিটারী ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলি গ্রামের রুবেল মিয়া বলেন, ‘আমার তিনটা ঘরে কোমড় পানি উঠেছিল। এখন দুইটা থেকে পানি নেমে আঙ্গিনায় গেছে। রান্না ঘরে এখনো হাঁটুপানি রয়েছে। তবে অন্যান্য ঘরগুলোতে প্রচুর কাদা জমে যাওয়া খুব অসুবিধা হচ্ছে। পায়ে বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দিয়েছে।

গঙ্গাচড়ার বিনবিনিয়া এলাকার কৃষক সাদেকুল ইসলাম জানান, কচুরিপানা সরানো না গেলে কোনো আমনের আবাদ হবে না। ফাঁকা জায়গা না থাকার কারণে কচুরিপানা সরানো যাচ্ছে না।
তিনি ১০ বিঘা জমিতে আমন আর দেড় বিঘায় লালশাক আবাদ করেছেন। সবই এখন পানিতে পচে গেছে বলে জানিয়েছেন।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৈয়দা সিফাত জাহান বলেন, ‘পাঁচ জেলার তিন হাজার হেক্টর আমনের আবাদ পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। দুই-একদিনের মধ্যে পানি সরে না গেলে এসব আবাদ নষ্ট হয়ে যাবে।’ তাই কৃষকদের কচুরিপানা ও বন্যার পলিমাটি ধানখেত থেকে সরানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, মঙ্গলবার দুপুরে তিস্তার লালমানিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার এবং রংপুরের কাউনিয়ার তিস্তা সেতু পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নিমজ্জিত বাসাবাড়ি, রাস্তাঘাট থেকে পানি নামতে শুরু করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, রোববার রাত ৮টার পর থেকে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় তিস্তা অববাহিকার ১৫২ কিলোমিটার এবং ধরলা ও ব্রক্ষপুত্র এলাকার ৩৬০ কিলোমিটার এলাকার চরাঞ্চল ছাড়াও নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল। এতে হাজার হাজার হেক্টর জমির আমন ধান, সবজির আবাদ এখনো অথৈ পানির নিচে রয়েছে। হাজার হাজার পুকুর তলিয়ে লাখ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
বন্যার পানি বাসাবাড়ি-রাস্তাঘাট থেকে নেমে গেছে। তবে আমনের আবাদ এখনো অনেক জায়গায় পানির নিচে রয়েছে। কৃষি বিভাগকে তালিকা করে ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল বলেন, ‘আমার তিনটি উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকেছিল। এখন পানি নেমে গেছে। কৃষি বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কৃষকদের পাশে থাকতে।’
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, তিস্তা অববাহিকার পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে, রোববার মধ্যরাত থেকে তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছিলেন। বাড়িঘরে পানি উঠে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন মানুষজন। চরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলগুলো থেকে মানুষজন বাড়িঘর ছেড়ে গবাদিপশুসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেন।


