বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে সুশাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রত্যাশা জানালেন দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিকেরা। শনিবার গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারেক রহমান। সেখানেই নিজেদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন সিনিয়র সাংবাদিকরা।
একই সঙ্গে তারেক রহমানের জন্য নিজ নিজ পরামর্শও তুলে ধরেন তারা। জবাবে সিনিয়র সাংবাদিকদের পরামর্শ বিবেচনার কথা জানান তারেক রহমান। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
তদন্ত কমিটি ও সাংবাদিকদের পেনশন: শফিক রেহমান
প্রবীণ সাংবাদিক ও ‘যায়যায়দিন’ সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, “খালেদা জিয়া শুধু জেলবন্দি ছিলেন না, তাকে স্বজনদের সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হয়নি। আমার বিশ্বাস ম্যাডাম খালেদা জিয়ার অকাল মৃত্যু হয়েছে। এই পরিস্থিতি কেন হলো, তার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত।” তিনি বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে টাকা চুরির ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠনের দাবি জানান। এছাড়া তিনি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা যেন সাংবাদিকদের জন্য একটি স্থায়ী পেনশনের ব্যবস্থা করেন।”
জলবায়ু পরিবর্তন ও সুশাসন: মাহফুজ আনাম
‘দ্য ডেইলি স্টার’ সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, “আমরা গণতন্ত্র, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সুশাসন চাই। তবে বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না।” তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্লাইমেট চেঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তন। বাংলাদেশ ফ্রন্টলাইন দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো এটি নিয়ে তেমন আলোচনা করছে না। কোস্টাল এরিয়াতে এর প্রভাব এখনই দৃশ্যমান। তাই ক্লাইমেট চেঞ্জ যেন আপনার (তারেক রহমানের) রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকে।”
মব ভায়োলেন্স ও উগ্রবাদ প্রসঙ্গ: মতিউর রহমান চৌধুরী
‘দৈনিক মানবজমিন’-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, “তারেক রহমানের কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা, তেমনি সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ যদি শুধু দলের মধ্য থেকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করা হয়, তবে অতীতের মতোই ভুল হবে।” তিনি বর্তমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, “২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর মিডিয়া অনেকটাই স্বাধীন হলেও মব ভায়োলেন্সের কারণে আমরা সাহসী হতে পারছি না। সংবাদপত্র অফিসে যখন আগুন দেওয়া হয়, তখন ভাবতে কষ্ট লাগে আমরা বেহেশতে না জাহান্নামে আছি!” তিনি আরও বলেন, দেশ আজ অস্তিত্ব সংকটে এবং উগ্রবাদ আমাদের গ্রাস করার চেষ্টা করছে। এই উগ্রবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে তারেক রহমানের বিকল্প নেই।
গণতান্ত্রিক পরিবেশের দাবি: নূরুল কবীর
‘নিউ এজ’ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, “পৃথিবীর কোথাও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি যেখানে গণমাধ্যমের আইনগত ও সামাজিক স্বাধীনতা ছিল না। গণতন্ত্রের সংগ্রাম আর মিডিয়ার স্বাধীনতা হাত ধরাধরি করে চলে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা এখন একটি উত্তরণকালীন সময়ে আছি যেখানে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন ঘটেছে। কিন্তু মানুষের আত্মদানের ভিত্তিতে যে আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন, তা এখনো গড়ে ওঠেনি। এজন্য রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”
মিডিয়ার সুবিধাবাদ ও প্রকৃত ইতিহাস: মাহমুদুর রহমান
‘আমার দেশ’ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, “বিগত ১৬-১৭ বছরে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ ভয় ও সুবিধাবাদের কারণে নির্যাতিত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ায়নি। রুহুল আমিন গাজীকে চিকিৎসা ছাড়া মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, প্রবীণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে—অথচ মিডিয়া তখন নীরব ছিল।” তিনি তারেক রহমানকে সতর্ক করে বলেন, “আপনি ১৭ বছর দেশে ছিলেন না। আপনার বিশিষ্ট লোকজন বা মিডিয়ার নতুন বন্ধুরা যা বলছে, তাই হয়তো আপনি শুনছেন। কিন্তু ১৭ বছরের প্রকৃত ইতিহাস ভিন্ন।” তিনি ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের ৫০ বছরের বাস্তব ইতিহাস বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ইনকিলাবের ওপর নির্যাতন: এএমএম বাহাউদ্দীন
‘দৈনিক ইনকিলাব’ সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন বলেন, “তারেক রহমানই আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী হবেন। তবে ৫ আগস্টের আগের ও পরের সাংবাদিকতার পার্থক্য মনে রাখতে হবে। বিগত ১৮ বছর বন্দুকের নলের মুখে সাংবাদিকতা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল।” তিনি ইনকিলাব অফিসের ওপর নির্যাতনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমাদের নিউজ এডিটরসহ ৬ জনকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, আমি নিজে পলাতক ছিলাম। শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমান ও আবুল আসাদসহ সবার ওপর হওয়া অন্যায়ের খবর ইনকিলাব ছাপিয়েছে। তারেক রহমানের আজকের যে বিশাল ব্যক্তিত্ব, তা বিগত সময়ের স্বাধীন সাংবাদিকতার মাধ্যমেই তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর বনানীতে শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় হাসান হাফিজ (কালের কণ্ঠ), আবদুল হাই শিকদার (যুগান্তর), সালাহ উদ্দিন বাবর (নয়া দিগন্ত), তৌফিক ইমরোজ খালিদীসহ (বিডিনিউজ ২৪) দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের অসংখ্য জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।


