তারেকের নজরে আসতে বিএনপি নেতাদের ‘দৌড়’ 

তারেকের নজরে আসতে বিএনপি নেতাদের ‘দৌড়’ 
Advertisement
Advertisement

ঘটনার শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাদের দৌড় দিয়ে, পরে তা এখন বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন পেরিয়ে এক প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছেছে।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের গাড়ির পাশে নেতাকর্মীদের দৌড়ে চলার একের পর এক দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা, ব্যঙ্গ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দলের ভেতরেও অনেকে একে নেতার দৃষ্টি কাড়ার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন।

দুই দশক পর বিএনপির ক্ষমতায় ফেরা এবং ১৭ বছর পর তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের উচ্ছ্বাস এখনো দলজুড়ে প্রবল।

আওয়ামী লীগ কার্যত সক্রিয় রাজনীতির বাইরে চলে যাওয়া এবং জামায়াতে ইসলামীকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখার কারণে দলের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ এখন দলীয় প্রধানের নজরে আসতেই বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছেন।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমান নিজেই তার চারপাশের কঠোর নিরাপত্তাবলয় কিছুটা শিথিল করার চেষ্টা করেছেন। ফলে ঢাকা ও বাইরে বিভিন্ন সফরে নেতাকর্মীরা তার গাড়িবহরের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আর সেই সুযোগ থেকেই শুরু হয়েছে দৃশ্যমান প্রতিযোগিতা।

নজরে আসার চেষ্টার প্রথম আলোচিত ঘটনা ঘটে ২৬ ফেব্রুয়ারি। সেদিন প্রধানমন্ত্রী বাংলা একাডেমিতে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনে যান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর এলাকায় গাড়িবহর যাওয়ার সময় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে গাড়িবহরের পাশে দৌড়ে গিয়ে তাকে অভিবাদন জানাতে দেখা যায়।

ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক ট্রলের জন্ম দেয়।

পরে ফেসবুক পোস্টে রাকিব নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, গাড়িটি দ্রুতগতিতে চলছিল এবং তিনি মাত্র ‘৫ থেকে ৭ সেকেন্ড” দৌঁড়েছিলেন, যাতে ছাত্রদলের অন্য কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়।

‘হয়তো এটা এড়িয়ে যাওয়া যেত’, স্বীকার করে গণমাধ্যমের সমালোচনা করে তার দাবি, প্রায় তিন ঘণ্টার কার্যক্রমের মধ্যে মাত্র ‘১০ সেকেন্ড’ নিয়ে ‘নেতিবাচক শিরোনাম’ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

তবে সেখানেই এই প্রবণতা থেমে থাকেনি। ১২ মে তারেক রহমান আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. আবিদুল ইসলাম খানকেও গাড়িবহরের পাশে দৌড়াতে দেখা যায়। সেই ভিডিওও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

সমালোচনার মুখে পরে ফেসবুক লাইভে আবিদুল বলেন, যানজটের কারণে তিনি পিছিয়ে পড়েছিলেন এবং তিনি মূলত ‘দ্রুত যাওয়ার জন্য’ দৌড়েছিলেন। তার দাবি, তিনি গাড়িবহরের একেবারে সামনে দৌঁড়াননি।

তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৬ মে প্রধানমন্ত্রীর চাঁদপুর সফরে।

সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে গাড়িবহর গুলশান থেকে সড়কপথে রওনা দেয়। কাকরাইল মোড়ে যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নকে একটি প্রটোকল গাড়ির সামনে দৌঁড়াতে দেখা যায়। তিনি স্লোগান দিতে দিতে এবং সালাম জানাতে জানাতে গাড়িবহরের পাশে ছুটছিলেন।

একই দিন টিকাটুলীতে প্রধানমন্ত্রীর বাসের সামনে দৌড়ে আলোচনায় আসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনও।

ঘটনাটি আরও বড় আলোচনা তৈরি করে। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, নিয়মিত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকা একজন প্রতিমন্ত্রীর কেন এভাবে প্রকাশ্যে আনুগত্য দেখানোর প্রয়োজন পড়ল।

এর পর থেকে ইশরাক প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। টাইমস অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ঘটনার পর গণমাধ্যমে নিয়মিত কথা বলা নয়নও ফোন ধরা বন্ধ করে দেন।

কেন তিনি গাড়িবহরের পাশে দৌড়েছিলেন—টাইমস অব বাংলাদেশের এমন প্রশ্নে রাকিব সমালোচনাকে গুরুত্ব দেননি।

তিনি বলেন, ‘এটা কোনো দৌড় না। আমরা সব সময় স্যারের নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুত। আমরা আমাদের দলীয় চেয়ারম্যানের নিরাপত্তা চাই।’

তবে প্রধানমন্ত্রীকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) নিরাপত্তা দেওয়ার পরও কেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে—এ প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি দেননি।

স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানিও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘নেতার নিরাপত্তার জন্য আমরা সব সময় মাঠে আছি। আমরা তার পাশেই থাকব।’

অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খান এসব ঘটনায় অস্বাভাবিক কিছু দেখছেন না। তার মতে, ‘এটা স্বাভাবিক। দলীয় চেয়ারম্যান রাস্তায় থাকলে স্বাভাবিকভাবেই নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে থাকবেন।’

তবে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বিএনপির কিছু নীতিনির্ধারক স্বীকার করছেন, এসব আচরণ দলের ভেতরের গভীর প্রতিযোগিতার প্রতিফলন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আর এক সিনিয়র নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী কোনো কর্মসূচিতে যাবেন শুনলেই নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। টাইমসতে তিনি বলেন, ‘আসলে সবকিছুই প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজেকে পরিচিত করা এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরির কৌশল।’

এসব ঘটনাকে আরও কঠোর ভাষায় ‘রাজনৈতিক উন্মাদনা’ ও ‘ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লোভ’ বলে মন্তব্য করেন আর এক সিনিয়র নেতা।

‘মানুষের জন্য কাজ করা এবং আদর্শের রাজনীতি করার বদলে নেতারা রাজনীতিকে প্রদর্শনীতে পরিণত করছেন। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে,’ বলেন তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad