রাজধানীতে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি হলেও এসব ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা। স্বজনেরা বিচার চেয়ে মামলা করলেও বছরের পর বছর ধরে তা ঝুলে আছে। অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে, আবার কিছু ঘটনায় মামলা পর্যন্ত দায়ের হয় না। ফলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর বিচারগুলো একপ্রকার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
বিগত কয়েক বছরের অগ্নিকাণ্ডের মামলাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো একটি ঘটনারও বিচার কার্যক্রম এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণের জটিলতায় থমকে আছে সবকিছু।
আগুনে মৃত্যুর মামলায় এই বিচারহীনতার পেছনে আইনি দুর্বলতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী। তিনি জানান, দেশে এখনো অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর মতো ঘটনায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জন্য কোনো আধুনিক বা বিশেষ আইন নেই। ফলে প্রচলিত আইনের মারপ্যাঁচে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় এবং আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মামলাগুলো টেকানোও কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে তিনি একটি বিশেষ ও যুগোপযোগী আইনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
তদন্তে আটকা রূপনগর অগ্নিকাণ্ডের বিচার:
গত বছর অক্টোবর মাসে মিরপুরের রূপনগরের শিয়ালবাড়িতে একটি রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন প্রাণ হারান। নিহত পোশাকশ্রমিক ছানোয়ার হোসেনের ভাই সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে ‘আলম কেমিক্যাল গোডাউন’-এর মালিক শাহ আলমসহ আটজনের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেন। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন গুদামের ব্যবস্থাপক আকরাম এবং কয়েকটি ওয়াশ ও প্রিন্ট ফ্যাক্টরির মালিক ও ব্যবস্থাপক। মামলাটি দায়েরের পর চার মাস পার হলেও তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এই মামলার প্রধান আসামি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং অন্য আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান জানান, আলমের কেমিক্যাল থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল এবং সেখানে কেমিক্যাল রাখার কোনো আইনি অনুমতি ছিল না। বর্তমানে তদন্ত চলছে এবং শিগগিরই চার্জশিট দাখিল করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
মামলাহীন উত্তরা অগ্নিকাণ্ড:
চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ৬ জন নিহত হন। তবে মর্মান্তিক এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই মামলা বা অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। উত্তরা পশ্চিম থানার তদন্ত কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ রফিক আহমেদ জানান, তারা মরদেহগুলোর সুরতহাল প্রতিবেদনসহ স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। তবে কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অর্ধযুগেও চুড়িহাট্টা ট্রাজেডির বিচার শেষ হয়নি:
পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শেষ হয়নি। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতের সেই বিস্ফোরণে ৭১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। ঘটনার পরদিন স্থানীয় বাসিন্দা মো. আসিফ চকবাজার থানায় মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হলেও দুই বছরেও বাদী ও সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এই মামলায় এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং ৭ জনকে সমন পাঠানো হয়েছে। মামলার ৮ জন আসামিই বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন।
আরমানীটোলা ও বনানীর এফআর টাওয়ার ট্রাজেডি:
২০২১ সালের ২৩ এপ্রিল আরমানিটোলার মুসা ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডে ৫ জন নিহত ও ২১ জন আহত হওয়ার ঘটনায় ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। বংশাল থানা পুলিশের করা এই মামলায় আসামিরা সবাই জামিনে আছেন। এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র ২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয়েছে। আদালতের পিপি মো. শফিকুল ইসলাম জানান, বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও সাক্ষীরা হাজির না হওয়ায় বিচার কাজে গতি আসছে না।
অন্যদিকে, ২০১৯ সালের বনানীর এফআর টাওয়ারে ২৭ জনের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ মামলা করলেও তদন্ত নিয়ে দেখা দেয় নানা জটিলতা। ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রের ওপর আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিলে পিবিআই সম্পূরক চার্জশিট জমা দেয়। সেখানে রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যানকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয় এবং অন্যান্য আসামিরা জামিনে মুক্তি পান। পিবিআই-এর তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান জানান, তিনি অনেক আগেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, কিন্তু এরপর বিচার কার্যক্রম আর সামনে এগোয়নি।
মানবাধিকার কর্মীদের বিশেষ আইনের দাবি:
আগুনে পুড়ে মৃত্যুর ঘটনায় বিচারহীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা। ‘আমরাই পারি জোট’-এর নির্বাহী পরিচালক জিনাত আরা হক মনে করেন, আবাসন পরিকল্পনার ত্রুটি ও সরকারি তদারকির অভাবই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।
তিনি বলেন, এসব মামলায় ভিকটিমকেই এককভাবে আইনি লড়াই লড়তে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তাই সরকারকে এসব মামলায় আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।
বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী মোস্তফা কামাল খান বলেন, বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থাতেই গলদ রয়েছে। ঘনঘন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন, সাক্ষীদের অসচেতনতা ও আদালতে মামলা-জটের কারণে বিচারপ্রক্রিয়া স্থবির হয়ে থাকে। এই সংকট থেকে উত্তরণে দ্রুত বিচারিক কাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন।


