২০০৭ সালে সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার সরিয়ে গঠিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘বাড়াবাড়ি করা’ সেনা কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপি সরকার। লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর আরও চার সাবেক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া মাসুদ উদ্দিন ও শেখ মামুন খালেদকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মানব পাচার মামলায় মাসুদ এবং হত্যা মামলায় শেখ মামুন পাঁচ দিন করে রিমান্ডে আছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে তারা দুজনই চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন। এর মধ্যে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ভূমিকা, অর্থপাচার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে কার ভূমিকা কী ছিল সে ব্যাপারে প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।
এক-এগারোর সময় তিন বাহিনীর প্রধানরা, ডিজিএফআই ও এনএসআই প্রধানসহ বেশ কয়েকজন সামরিক এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তার ব্যাপারে তথ্য জানতে চাইলে কৌশলে তারা নিজেদের সম্পৃক্ততা এড়ানোর চেষ্টা করছেন।
ওই সময়ে আলোচিত সব সামরিক কর্মকর্তার ব্যাপারেও তথ্য অনুসন্ধান শুরু করেছে ডিবি পুলিশ। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গভবনে প্রবেশ ও অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সরিয়ে সেনা-সমর্থিত সরকার গঠনে যাদের ভূমিকা ছিল তাদের ব্যাপারে এই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার কাছে তথ্য চাওয়া হচ্ছে। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এ বিষয়ে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, রিমান্ডে মামুন খালেদকে টানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক প্রশ্নের জবাব মিলছে। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে তার ভূমিকা ও মিরপুরে নিহত ফল ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলার ব্যাপারেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার (সাইবার) সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, মাসুদ চৌধুরীকে মানবপাচার সিন্ডিকেট ও অর্থ পাচারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তিনি এক-এগারোতে নিজের সম্পৃক্ততা ও অন্যদের ব্যাপারে প্রশ্নর জবাব এড়িয়ে যাচ্ছেন। তাদের দুজনের দেওয়া তথ্য যাচাই বাছাই করা হচ্ছে বলে জানান সৈয়দ হারুন অর রশীদ।
লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তাকে পল্টন থানার মানব পাচারসংক্রান্ত একটি মামলায় গত মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শনিবার ছিল রিমান্ডের চতুর্থদিন।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে হত্যা, মানি লন্ডারিং, মানব পাচার, প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট ১১টি মামলা রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কাজ শুরু করেছে।
এদিকে, গত বুধবার রাতে ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে শেখ মামুন খালেদকে আটক করে ডিবি পুলিশ। পরদিন জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মিরপুরে ফল ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ডিবি হেফাজতে শনিবার ছিল তার রিমান্ডের প্রথম দিন।
তিনি ২০০৭-০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইয়ে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি একই পদে ছিলেন। এরপর ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন।
চার সাবেক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ব্রি. জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী, ব্রি. জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, মেজর জেনারেল (অব.) সাঈদ জোয়ার্দার এবং দুদক প্রধান লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরীও ছিলেন নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত। তাদের কেউ দেশে নেই। রিমান্ডে থাকা সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা তাদের ঘনিষ্ট। বিদেশে সাবেক ওইসব সেনা কর্মকর্তারা কোথায় আছেন, তাদের বিনিয়োগ কোথায়, তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের যোগাযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছিল এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ডিবির একাধিক কর্মকর্তা টাইমসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।


