বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে বিশ্বকাপে নকআউটের আশা বাঁচিয়ে রেখেছে ইরান। সোফাই স্টেডিয়ামের মাঠের লড়াই শেষে ড্রেসিংরুমে একটি হাতে লেখা বার্তা রেখে গেছে তারা। মাঠের বাইরের নানা জটিলতায় ভরা টুর্নামেন্ট অভিযানের আরেকটি অধ্যায় এভাবে শেষ হলো দলটির।
লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরান তাদের ‘জি’ গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচটি শেষ করার পর এই অনন্য বার্তাটি সামনে আসে। পুরো ফুটবল অঙ্গনে এখন এই চিরকুট নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে।
দলটি সোফাই স্টেডিয়ামে তাদের দুটি ম্যাচ খেলেছে। তবে লস অ্যাঞ্জেলেসে তাদের থাকার স্থায়ী কোনো অনুমতি ছিল না। প্রতিবার ম্যাচ শেষে মেক্সিকোর টিজুয়ানায় অবস্থিত তাদের মূল ক্যাম্পে ফিরে যেতে হয়েছে ফুটবলারদের।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের টুর্নামেন্টের সূচিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। যাতায়াতের এই ধকল দলের পারফরম্যান্সেও প্রভাব ফেলতে পারত। এমনকি দলের বেশ কয়েকজন স্টাফ ও কর্মকর্তা দেশটিতে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন।
ইরানের ফুটবল ফেডারেশন পরবর্তীতে ড্রেসিংরুমে রেখে যাওয়া এই বার্তাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে। বার্তায় রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে ফুটবলীয় সম্প্রীতির সুর ফুটে উঠেছে।
চিরকুটে লেখা ছিল, ‘হাজার বছর আগের প্রাচীন পারস্য থেকে শুরু করে আজকের সভ্য ইরান পর্যন্ত–ইরানের চেতনা চিরঞ্জীব ও অবিচল। লস অ্যাঞ্জেলেস, আপনাদের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ।’
বার্তায় তারা আরও উল্লেখ করে, ‘আমরা গর্ব নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে এসেছিলাম, সম্মানের সঙ্গে লড়াই করেছি এবং মর্যাদার সঙ্গে বিদায় নিচ্ছি।’
এই বার্তায় সেইসব সমর্থকদেরও বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে যারা মাঠে উপস্থিত ছিলেন। শহরের মাটিতে খেলা দুটি ম্যাচের সময় তারা ইরান দলকে “হৃদয়, কণ্ঠ ও উজাড় করা সমর্থন” দিয়ে উৎসাহিত করেছিলেন।
বার্তাটির শেষাংশে বিশ্বমঞ্চের একটি বড় বার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিশ্বের সকল জাতির মধ্যে শান্তি, শ্রদ্ধা এবং বন্ধুত্বের আহ্বান জানায় ইরান দল।
অবশ্য টুর্নামেন্ট চলাকালীন যাতায়াত বা ভ্রমণ ব্যবস্থার নানা ত্রুটি নিয়ে ইরান বারবার ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বারবার সীমান্ত পারাপারের বিষয়টি তাদের স্বাভাবিক প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।
কোচ আমির ঘালেনোই এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছেন কয়েকবার। তিনি দাবি করেছেন, তার খেলোয়াড়দের এমন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে যা অন্য কোনো দলকে এই বিশ্বকাপে পোহাতে হয়নি।
মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দলের এই প্রতিনিয়ত যাতায়াতের বিষয়টি পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। গণমাধ্যমগুলোও এই বৈষম্য নিয়ে সোচ্চার ছিল।
পরিস্থিতি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কিছুটা নরম হয়েছেন। তারা এই নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা যায় কিনা, তা নিয়ে পর্দার আড়ালে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে সব চাপ সামলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এই ড্রয়ের কল্যাণে শেষ ১৬ বা প্রি-কোয়ার্টারে ওঠার দৌড়ে ভালোভাবেই টিকে রইল ইরান। মাঠের পারফরম্যান্সে তারা দেখিয়েছে অভাবনীয় শৃঙ্খলা।
সোফাই স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করে ইরান তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিল। প্রথম ম্যাচেই তারা পিছিয়ে পড়েও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায়।
এরপর একই ভেন্যুতে তারা শক্তিশালী বেলজিয়ামকে রুখে দিয়ে মূল্যবান ১ পয়েন্ট তুলে নেয়। দুই ম্যাচ থেকে ইরানের সংগ্রহ এখন ২ পয়েন্ট।
পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ হাতছানি দিতে থাকায় ইরান শিবিরে এখন স্বস্তি। মিশরীয়দের বিপক্ষে নিজেদের শেষ গ্রুপ ম্যাচ খেলতে তারা এখন সিয়াটলের উদ্দেশে রওনা হবে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঠের ফুটবলের গল্পটি ছিল মূলত শৃঙ্খলা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের সামনে তারা ইস্পাতকঠিন রক্ষণ ধরে রেখেছিল।
তবে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে শেষ দৃশ্যটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও মানবিক। আরেকটি নতুন সফরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে কাগজের পাতায় ইরানের রেখে যাওয়া এক চিরকুট ফুটবলকে ছাড়িয়ে এক পশলা শান্তি এনে দিল।


