পুরান ঢাকার সরু গলিগুলোতে এক সময় ব্যবসা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে যে হালখাতা উৎসব চলত, তা এখন জৌলুস হারাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে লাল হালখাতা। ব্যবসায়ীদের মতে, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ পদ্ধতির প্রসারের ফলে শতবর্ষী এই লাল খাতার ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে।
মূলত বকেয়া আদায় আর নতুন খাতা খোলার এই উৎসবটি এখন কেবল টিকে থাকার লড়াই করছে।
শাঁখারীবাজারের নূর আলম প্রায় তিন দশক ধরে লাল মলাটের হিসাবের খাতা বিক্রি করছেন। তিনি জানান, বর্তমানে দোকানের সংখ্যা বাড়লেও ব্যবসার অবস্থা খুবই নাজুক। ব্যবসায়ীরা এখন আগের মতো আগ্রহ নিয়ে হালখাতা কেনেন না বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
ঐতিহ্যগতভাবে বাংলা নববর্ষের দিনে ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব বন্ধ করে এই লাল খাতায় নতুন বছরের লেনদেন শুরু করেন। এই উপলক্ষে ক্রেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মিষ্টি মুখ করানোর মাধ্যমে বকেয়া পাওনা আদায়ের একটি সুন্দর রীতি পালন করা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই প্রথাটি পুরান ঢাকার বাণিজ্যিক সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে এ বছর শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও শ্যামবাজারের মতো এলাকাগুলোতে উৎসবের আমেজ বেশ ম্লান। রাস্তাঘাটে আগের মতো সাজসজ্জা নেই, ক্রেতা-বিক্রেতাদের সেই চিরচেনা ভিড়ও চোখে পড়ছে না।
ব্যবসায়ীদের মতে, হালখাতা এখনও পালিত হলেও এর সেই পুরনো জাঁকজমক অনেক কমে গেছে।
শ্যামবাজারের পান বিক্রেতা মোহাম্মদ সিদ্দিক জানান, উদযাপন আগের মতো না হলেও মানুষ এখনও হালখাতায় আসে। তিনি সন্ধ্যায় দোকান সাজিয়ে অতিথিদের মিষ্টি, লাড্ডু ও ফল দিয়ে আপ্যায়নের প্রস্তুতি নিয়েছেন। উৎসবের মাধ্যমে ব্যবসার কিছুটা উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সনাতন পঞ্জিকা অনুসরণের কারণে তাঁতীবাজারের সুদীপ্ত সাহার মতো অনেক ব্যবসায়ী ১৫ই এপ্রিল হালখাতা পালন করেন। সেদিন ক্রেতারা দোকানে এসে মিষ্টি খেয়ে পুরোনো পাওনা মিটিয়ে দেবেন বলে তিনি জানান। অনেকের কাছেই এই বিশেষ দিনে পূজা ও ধর্মীয় আচার পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডিজিটাল হিসাব ব্যবস্থার কারণে কাগজের খাতার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন ফুরিয়ে আসছে। বিক্রেতা মোহাম্মদ মহসিন বলেন, সবকিছু ডিজিটাল হয়ে যাওয়ার কারণেই মূলত লাল খাতার চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে।
আর লাল খাতা বিক্রেতা নূর আলমের মতে, এটি কেবল ব্যবসায়িক মন্দা নয় বরং একটি দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবক্ষয়।


