সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সদস্যরা বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ে নিয়মিত কাজ করতেন। ডিজিএফআইয়ের একটি সভাকক্ষে তাদের কাজ করতে দেওয়া হতো এবং তারা কিছু মানুষকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ডিজিএফআইয়ের কাছে তালিকা দিতেন।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ গুম ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এসব দাবি করেন তিনি।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর ছত্রছায়ায় এই কাজটি হত। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। জেরা ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এর আগে রোববার এই মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
জবানবন্দিতে তিনি র্যাব ও ডিজিএফআইকে গণবিরোধী ও দেশবিরোধী ভূমিকার জন্য দায়ী করে এই দুটি সংস্থার বিলুপ্তি দাবি করেন। তার মতে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে এবং এখন আত্মশুদ্ধির সময় এসেছে।
তিনি জানান, সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার অধীনে থাকা আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ও ডিরেক্টরেট অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ছাড়াও বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য পেতেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বুঝতে পারেন, সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে।
জবানবন্দিতে তিনি তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। প্রথম ঘটনায়, র্যাব থেকে ফিরে আসা এক কনিষ্ঠ কর্মকর্তা তাকে জানান, অভিযানে ছয়জন মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে দুজনকে তিনি সরাসরি গুলি করেছেন। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের জন্য অর্থ পাওয়ার কথাও তিনি জানান এবং সেই অর্থ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করার কথা বলেন। সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, এতে তিনি ওই কর্মকর্তার গভীর অপরাধবোধ অনুধাবন করেন।
দ্বিতীয় ঘটনায়, একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানান, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশে ছয়জন নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছেন। ইকবাল করিম ভূঁইয়া তাকে প্রশ্ন করেন, আমি যদি আমার হাগু তোমাকে খেতে বলি খাবে কি না? সে বলল, না। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং হাগু খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট? সে বললো নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা। আমি তাকে বললাম, তাহলে কেন করেছ? এ প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা নীরব থাকে।
তৃতীয় ঘটনায়, র্যাবে কর্মরত এক মেজরের সঙ্গে তার কথোপকথনের কথা বলেন তিনি। একটি আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তদের আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে হত্যা করার ঘটনায় তিনি ওই কর্মকর্তাকে তিরস্কার করেন এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিরোধিতা করেন।
জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান আরও বলেন, আমি শুনেছি র্যাব যাদের হত্যা করতো, তাদের পেট চিরে নাড়িভুড়ি বের করে ইট পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত। র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখে আমি বিভিন্ন ডিভিশন এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভিজিট করতে থাকি এবং অফিসারদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে মোটিভেট করতে শুরু করি। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যত কমান্ডিং অফিসার আছে, তাদের ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করি। তাদের স্মরণ করিয়ে দিই শেখ মুজিব এবং জিয়া হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আরও কিছু সামরিক অফিসার ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে হাজতবাস করছে।
এরপর তিনি জানান, এক পর্যায়ে তিনি র্যাব, ডিজিএফআই ও বিজিবি থেকে সেনা কর্মকর্তা প্রেরণ বন্ধ করে দেন, যদিও এতে তার ওপর তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে তাকে র্যাবে অফিসার দিতে অনুরোধ করেন। তবে তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং অবসর গ্রহণ পর্যন্ত সেই চাপ সহ্য করেন।
জবানবন্দির শেষাংশে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, তার বক্তব্য সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, বরং সেনাবাহিনীর মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য। তার মতে, অপরাধের দায় স্বীকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত হলে সেনাবাহিনীর সম্মান আরও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করার আহ্বান জানান এবং তা সম্ভব না হলে সেখানে কর্মরত সামরিক সদস্যদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনার দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ডিজিএফআইও তার নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা হারিয়েছে এবং সেটিও বিলুপ্ত করা উচিত।


