মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের মাত্র কয়েক দিন পর বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ১১টা ১৫ মিনিটে বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং একটি সামরিক ব্যান্ডদল।
ট্রাম্পের সফরের পরপরই পুতিনের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক যে এখনো অবিচল ও অটুট, তা দেখানো।
এর আগে, গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক দশকের মধ্যে প্রথম চীন সফর শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই পুতিনের এই সফরের খবর আসে। বিমানবন্দরে পুতিনের আগমনের দৃশ্যের সঙ্গে ট্রাম্পের আগমনের হুবহু মিল ছিল। দুই নেতাই বিমান থেকে লাল গালিচায় নেমে আসেন এবং চীনা তরুণরা ‘স্বাগত, স্বাগত’ বলে অভ্যর্থনা জানায়। তবে এবার মার্কিন পতাকার বদলে তারা রাশিয়ার পতাকা ওড়াচ্ছিল।
ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পুতিন ও শি রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব কীভাবে আরও জোরদার করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করবেন এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে মতবিনিময় করবেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
বিশ্বমঞ্চে রাশিয়া কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পর থেকে পুতিন প্রতিবছর বেইজিং সফর করছেন। তবে তাদের সম্পর্ক মোটেও সমপর্যায়ের নয়। মস্কো অর্থনৈতিকভাবে বেইজিংয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, কারণ চীনই নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত রুশ তেলের প্রধান ক্রেতা।
বৈঠকে দুই নেতা মঙ্গোলিয়ার মধ্য দিয়ে রাশিয়া থেকে চীনে ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। এটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমুদ্রপথে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের একটি স্থলভিত্তিক বিকল্প, যা চালু করতে মস্কো বেশ আগ্রহী। সফরের আবহকে উষ্ণ করতে শি এবং পুতিন গত রোববার দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একে অপরকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন মঙ্গলবার দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের প্রশংসা করেন।
চীনা জনগণের উদ্দেশে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় পুতিন বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক সত্যিই এক নজিরবিহীন স্তরে পৌঁছেছে এবং রাশিয়া ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
কোনো তৃতীয় দেশের নাম উল্লেখ না করে তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বিশ্বব্যাপী একটি প্রধান ও স্থিতিশীল ভূমিকা পালন করছে। কারও বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ না হয়ে, আমরা শান্তি ও সর্বজনীন সমৃদ্ধি কামনা করি।’
বৈঠকের পর দুই নেতা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করবেন বলেও আশা করা হচ্ছে।
‘প্রিয়, পুরোনো বন্ধু’
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পুতিনের শেষ বেইজিং সফরের সময় শি জিনপিং তাকে ‘পুরোনো বন্ধু’ হিসেবে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন, যে সম্বোধন তিনি গত সপ্তাহে ট্রাম্পের প্রতি করেননি। সে সময় পুতিনও পাল্টা শি’কে তার ‘প্রিয় বন্ধু’ বলে ডাকেন। তিনি বিশ্বকে দেখাতে আগ্রহী যে ট্রাম্পের সফরে তাদের সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়েনি।
ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, ‘পুতিনের সফর ট্রাম্পের মতো জমকালো হবে বলে আশা করা না হলেও শি-পুতিন সম্পর্কের জন্য এই ধরনের দেখানোধারী আশ্বাসের প্রয়োজন নেই।’
তিনি বলেন, উভয় পক্ষই এই সম্পর্ককে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের চেয়ে ‘কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী এবং আরও স্থিতিশীল’ মনে করে।
বেইজিং ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য নিয়মিত আলোচনার আহ্বান জানালেও সৈন্য পাঠানোর জন্য রাশিয়ার কখনো নিন্দা করেনি, বরং নিজেকে একটি নিরপেক্ষ পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ট্রাম্প ও শি গত সপ্তাহে ইউক্রেন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোনো যুগান্তকারী সমাধান ছাড়াই চীন ত্যাগ করেন।
কিম বলেন, শি নিশ্চিতভাবেই পুতিনকে ট্রাম্পের সঙ্গে তার শীর্ষ বৈঠকের বিষয়ে অবহিত করবেন। তবে শি-ট্রাম্প বৈঠক থেকে কোনো স্পষ্ট ফলাফল না আসা ‘সম্ভবত মস্কোকে আশ্বস্ত করে, শি ট্রাম্পের সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতা করেননি যা রাশিয়ার স্বার্থকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষুণ্ন করবে।’
তেলের চাহিদা
পুতিন আশা করবেন যেন চীন মস্কোর প্রতি তার প্রতিশ্রুতি আরও গভীর করে। কারণ ট্রাম্প তার সফরকালে ‘ফক্স নিউজ’কে বলেছিলেন, বেইজিং তাদের শক্তির ‘অতৃপ্ত’ ক্ষুধা মেটাতে মার্কিন তেল কিনতে সম্মত হয়েছে।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাশিয়া চীনের কাছে তেল বিক্রির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ‘পুতিন সেই সমর্থন হারাতে চান না’, এশিয়া সোসাইটির লাইল মরিস এএফপিকে বলেন।
মরিস আরও বলেন, ‘পুতিন সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে চীনের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে শি’র কাছ থেকে জানতে আগ্রহী হবেন, বিশেষ করে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়ার পর তিনি বেইজিংকে সেখানে একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখতে চান।’
তবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রশ্নে চীন ও রাশিয়ার অগ্রাধিকার ভিন্ন হতে পারে। সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির জেমস চার এএফপিকে বলেন, ‘(চীন) তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বিশ্বের প্রধান জলপথগুলোর স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করে। তাই তারা চাইবে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা যত দ্রুত সম্ভব শেষ হোক।’
‘অন্যদিকে, মস্কো ‘রুশ জ্বালানি সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কারণে ইরানের যুদ্ধ থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে, তাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে’, তিনি বলেন।
রাশিয়ার শীর্ষ কূটনীতিক সের্গেই লাভরভ এপ্রিলে শি’র সঙ্গে বৈঠকের পর বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করায় রাশিয়া চীনের জ্বালানি ঘাটতি ‘পূরণ’ করতে পারে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জোসেফ ওয়েবস্টার বলেন, ‘জ্বালানি সম্পর্কের সম্প্রসারণ এই বৈঠকে প্রাধান্য পেতে পারে, কারণ বেইজিং আরও রুশ জ্বালানি চাইছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘মস্কোর দৃষ্টিকোণ থেকে, ইউক্রেন কর্তৃক রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো ক্রমাগত অভিযানের পর, পূর্বে (চীনে) আরও তেল পাঠানো তাদের জন্য বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।’


