চলতি বছরের মর্যাদাপূর্ণ ‘টাইম ১০০ ফিলানথ্রপি’ তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্।
২০২৫ সালে শুরু হওয়া এই তালিকায় প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনিই এই স্বীকৃতি পেলেন। প্রতি বছর টাইম ম্যাগাজিন ‘টাইম ১০০ ফিলানথ্রপি’ তালিকার মাধ্যমে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সম্মানিত করেন, যারা জনকল্যাণ ও সমাজ পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন।
২০২৬ সালের এই সংস্করণে বৈশ্বিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং কাঠামোগত পরিবর্তনে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা রাখা নেতা, জনহিতৈষী ও উদ্ভাবকদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আসিফ সালেহ্ ‘নেতৃত্ব’ ক্যাটাগরিতে এই স্বীকৃতি পেয়েছেন। ব্র্যাকের স্থানীয় নেতৃত্বভিত্তিক উন্নয়ন মডেলকে এগিয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহায়তায় আরও ন্যায্য ও টেকসই পদ্ধতির পক্ষে কাজ করার জন্য তাকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
রাজীব জে শাহ, ইদ্রিস এলবা ও সাবরিনা ধৌরে এলবা এবং লিওনেল মেসির মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি এই তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন।
টাইম তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন ব্র্যাকের বহুমুখী অর্থায়ন কৌশল ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীভিত্তিক কাজের ধারা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠিত হয়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে ব্র্যাক বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি কার্যকর উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলেছে, যা পরবর্তী সময়ে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ অনুসরণ করেছে। বিশ্বজুড়ে ব্র্যাকের যে বিস্তৃত কর্মকাণ্ড, তার অধিকাংশই এসেছে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা থেকে।
টাইম উল্লেখ করেছে, ‘গত বছর বৈদেশিক সহায়তায় ব্যাপক কাটছাঁটের পর অনেকে বৈশ্বিক সহায়তার একটি উন্নত মডেলের দাবি তুলেছেন। ব্র্যাক এবং এর নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্-র কাছে হয়তো এর সমাধান আছে।’
সাময়িকীটি আরও উল্লেখ করে, অনুদান, বিনিয়োগ, সামাজিক অংশগ্রহণ, মাইক্রোফাইন্যান্স এবং সামাজিক উদ্যোগের একটি সমন্বিত মডেলের মাধ্যমে ব্র্যাক বৈশ্বিক অর্থায়নের সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে।
এমন স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় আসিফ সালেহ্ বলেন, ‘এই অর্জন এশিয়া ও আফ্রিকার সেসব মানুষের, যারা গত অর্ধশতাব্দী ধরে আমাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। একইসঙ্গে এটি আমাদের কর্মীদেরও অর্জন, যারা প্রতিদিন নিজ নিজ কমিউনিটির মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।’
টাইম ব্র্যাকের সেই দর্শনের ওপরও আলোকপাত করেছে, যেখানে সেবাগ্রহীতাদের শুধু সহায়তার ‘গ্রহীতা’ হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের ‘সক্রিয় অংশগ্রহণকারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আসিফ সালেহ্ বলেন, ‘উন্নয়ন কোনো দান বা চ্যারিটি নয়। চ্যারিটি হলো এমন কিছু যা আপনি মানুষকে দিচ্ছেন এবং সেখানে মানুষ পরোক্ষ গ্রহীতা হয়ে থাকে। আমরা ঠিক এর বিপরীত কাজটা করি, যেখানে আমাদের সব উদ্যোগেই মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।’
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আসিফ সালেহ্ বলেন, ‘বিশ্ব এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে— যেখানে চরম দারিদ্র্য আবার বাড়ছে, সংঘাতে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, আর জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমুখী ব্যয় লাখো মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এগুলো সেই বিশ্বের উপসর্গ, যে বিশ্ব সমতার প্রশ্নে যথেষ্ট সাহসী হতে পারেনি। তাই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এই সময়ের দাবি আরও বড়, আরও সাহসী উচ্চাভিলাষ— সত্যিকার অর্থে সবার জন্য সমান একটি বিশ্ব গড়ে তোলা। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন ভিন্ন এক পথ— যে পথে মানুষ সুবিধাভোগী নয়, বরং নিজের পরিবর্তনের চালিকাশক্তি।’


