রাজধানী ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাওয়ায় শহরের মাটির গঠন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ এই শূন্যতা ও মাটির স্তর দুর্বল হয়ে পড়ার ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে ঢাকা এখন এক নীরব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ভূমিধস ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এমডিপিআই-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরে প্রায় ০.৬ থেকে ২.৪ মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে। কয়েক দশক আগে যেখানে মাত্র ১০ থেকে ২০ মিটারে পানি পাওয়া যেত, বর্তমানে অনেক এলাকায় তার জন্য ৭০ মিটারের বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসা জানায়, রাজধানীর মোট পানি সরবরাহের প্রায় ৭৮ থেকে ৮০ শতাংশই আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। উত্তোলনের তুলনায় প্রাকৃতিক রিচার্জ বা পুনর্ভরণ অনেক কম হওয়ায় এই সংকট তীব্রতর হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর যেখানে ৩০০-৩৫০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি রিচার্জ হচ্ছে, সেখানে উত্তোলনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বা ৬০০-৭০০ মিলিয়ন ঘনমিটার।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও পরিবেশবিদ ড. আতিক রহমান বলেন, এক সময় ঢাকায় যে পানি অগভীর স্তরে মিলত, তা এখন ৭০ থেকে ২০০ মিটারের নিচে চলে গেছে। এটি একটি চাপগ্রস্ত প্রাকৃতিক সিস্টেমের স্পষ্ট লক্ষণ। তিনি জানান, বর্ষায় ভূগর্ভস্থ পানি খুব ধীরে রিচার্জ হয়। কিন্তু পাম্পের মাধ্যমে উত্তোলন চলে অবিরাম। ফলে মাটির নিচে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়।
ড. আতিক এই সংকটের পেছনে প্রকৌশলগত ও মানসিক দৈন্যতাকে দায়ী করে বলেন, অনেক প্রকৌশলী মনে করেন যত বেশি পানি তোলা যাবে, ততই তাদের কৃতিত্ব। কিন্তু প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টি নীতিমালায় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এর ফলে মাটি দুর্বল হয়ে জমি দেবে যাওয়া বা সিঙ্কহোল তৈরির ঝুঁকি আর অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।
গত ২০ বছরে ঢাকার মিরপুরে প্রায় ১০ ইঞ্চি, উত্তরায় ৯ ইঞ্চি এবং রমনা ও সেনানিবাস এলাকায় ৮ ইঞ্চি ভূমি অবনমন বা ধস রেকর্ড করা হয়েছে। সম্প্রতি ধানমন্ডির শঙ্কর এলাকায় রাস্তার মাঝখানে বড় গর্ত বা সিঙ্কহোল তৈরি হওয়ার ঘটনাটি নগরবাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় মাটির নিচের স্তর ক্ষয়ে গিয়ে ওপরের ভাগ দুর্বল হয়ে এমন ধস নামে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান জানান, ঢাকার আশেপাশে নদীগুলো মাত্রাতিরিক্ত দূষিত হওয়ায় বিকল্প উৎসের সংকট রয়ে গেছে। পদ্মা ও মেঘনা থেকে পানি আনার প্রকল্প নেওয়া হলেও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদাই মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী ১৫-২০ বছরের মধ্যে এই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
অধ্যাপক আদিল আরও বলেন, ইমারত বিধিমালায় বৃষ্টির পানি সংগ্রহের নির্দেশনা থাকলেও এর কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা বা সঠিক মনিটরিং নেই। পানির স্তর নিচে নামায় সৃষ্ট ‘আন্ডার-স্টেবিলিটি’ সমস্যার কারণে ভূমিকম্পের সময় মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে জানমালের ক্ষতি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
একই সুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সানজিদা মুরশেদ এই সংকটকে ‘গভীরতর ঝুঁকির নীরব সঞ্চয়’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, পানি উত্তোলনের ফলে সরাসরি ভূমিকম্প না হলেও এটি ভূগর্ভের উপাদানকে দুর্বল করে দেয়। ফলে অন্য কোনো কারণে ভূমিকম্প হলে শহরের ভবন ও অবকাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা সমন্বিত ও টেকসই সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন। ড. সানজিদা মুরশেদ মনে করেন, পানযোগ্য কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করলেও শিল্প ও গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে অবশ্যই উপরিভাগের পানি বা সারফেস ওয়াটার ব্যবহার করতে হবে। এজন্য পর্যাপ্ত শোধনাগার নির্মাণ জরুরি।
ড. আতিক রহমান গুরুত্ব দিয়েছেন নদী, খাল ও বিল পুনরুদ্ধারের ওপর, যাতে প্রাকৃতিক রিচার্জের পথ সুগম হয়। এছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় পানি রক্ষা ও পরিবেশ সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি নগরের কংক্রিট আচ্ছাদন কমিয়ে মাটির পানি শোষণ ক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


