জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাপনে অসহনীয় চাপ

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাপনে অসহনীয় চাপ
Advertisement
Advertisement

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ঘোষণা আসতেই দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পণ্য পরিবহন, পণ্য সরবরাহ ও আমদানি-রপ্তানি খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আগে থেকেই চড়া বাজারে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিল সাধারণ মানুষ। এখন তেলের নতুন দাম তাদের ওপর অসহনীয় চাপের সৃষ্টি করেছে।

ব্যবসায়ী নেতা ও খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত পুরো অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা এমনিতেই কিছুটা বিঘ্নিত ছিল। এর মধ্যেই দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রামের কনটেইনার ডিপোগুলোর ভাড়া এরই মধ্যে বেড়ে গেছে। ট্রাক ও লরি ভাড়া বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীবাহী বাসের ভাড়াও বাড়ানোর দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির এই প্রভাব দ্রুত সব খাতে ছড়িয়ে পড়বে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. রুমানা হক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পরিবহণ খাতের মধ্যে আটকে থাকবে না। এটি কৃষি উৎপাদন খরচ এবং শিল্প কারখানার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় খরচ বাড়বে এবং ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।

তিনি মনে করেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে নতুন এই চাপ সাধারণ মানুষের কষ্ট অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে।

বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে শনিবার রাতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অকটেন প্রতি লিটার ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা এবং পেট্রোলে ১৯ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।

এছাড়া ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দামও ২১২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখন একটি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহককে এক হাজার ৯৪০ টাকা দিতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন

ড. রুমানা হক আরও বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি রুখতে এখন কঠোর তদারকি জরুরি। সরকারের প্রতি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালী করার পরামর্শ দেন তিনি। বিশেষ করে প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে বলেন।

বাজারে আগুনের ছোঁয়া

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খুচরা বাজারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্রাক ভাড়া বাড়ায় পাইকারি বাজার থেকে পণ্য আনতে বেশি খরচ হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে দেখা গেছে, মুরগি, তেল, চাল ও ডিমের দাম আগে থেকেই বেশি ছিল। এখন তা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি সোনালী মুরগি ৩৯০ থেকে ৪০০ টাকা ও ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়।

সবজির বাজারও বেশ চড়া। বাজারে কাঁকরোল ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বরবটি, পটল, করলা ও বেগুনের দাম কেজি প্রতি ৮০ টাকার ওপরে।

হাতিরপুল বাজারের সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ রবিউল বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। মালবাহী ট্রাকও শহরে কম আসছে। এর ফলে বাজারে সরাসরি সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব পড়ছে।

সাধারণ মানুষ বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়া। নিউ মার্কেটে বাজার করতে আসা মোহাম্মদ আসিফ বলেন, আয় বাড়ছে না কিন্তু সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী। যদি এভাবে দাম বাড়তেই থাকে, তবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খরচও কমিয়ে দিতে হবে।

ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা

সরকার বলছে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। অথচ রোববার রাজধানীর প্রায় সব ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বাংলামটর, ফার্মগেট ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল ও গাড়ির ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তেলের দাম বাড়ায় চালকদের ভোগান্তি যেন আরও বেড়ে গেছে।

ফুডপান্ডা কর্মী মোহাম্মদ রানা উত্তরায় তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি জানান, তেলের দাম বাড়ায় তার প্রতিদিনের খরচ বেড়েছে। আয় না বাড়ায় বর্তমান সময়ে জীবন চালানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ফার্মগেটে একজন রাইড শেয়ারিং বাইক চালক জানান, তেলের দামের সাথে ভাড়ার সমন্বয় না হলে তাদের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পরিবহন খাতের সংকট

জ্বালানির দাম বাড়ানোয় বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক মালিক সমিতির নেতারাও উদ্বিগ্ন। তারা বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে একবার যাতায়াতে ট্রাক ভাড়া অন্তত ৫ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। পরিবহন মালিকরা এখন বাস ও ট্রাকের ভাড়া নতুন করে নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন। তারা দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে দুই টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে চার টাকা পাঁচ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

তবে এই দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ২০২২ সালে তেলের দাম বাড়ার সময় একবার ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। পরে তেলের দাম কমলেও ভাড়া কমানো হয়নি। তাই নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগে সব হিসাব খতিয়ে দেখা উচিত।

বন্দর ও পোশাক খাতে উৎকণ্ঠা

চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো তাদের চার্জ সাড়ে আট শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, ডিপোর সব কাজ ডিজেলচালিত মেশিনে চলে। তাই খরচ বাড়ায় চার্জ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এতে আমদানি-রপ্তানি পণ্য আনা-নেওয়ার খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কমে যাবে। বিজিএমইএ পরিচালক সাকিফ আহমেদ সালাম বলেন, তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বাড়বে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানায় জেনারেটর চালাতে অনেক তেল লাগে। এখন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যেতে পারে। এতে করে রপ্তানি আয়ে বড় ধস নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad