জুলাই অভ্যুত্থানে ‘নিহত ১৪শ’ ব্যক্তির তালিকা চেয়ে জাতিসংঘের কাছে চিঠি দিয়েছেন কানাডাভিত্তিক গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্সের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ হাবিবে মিল্লাত।
শনিবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের কাছে ওই চিঠি পাঠান তিনি।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্তে প্রকাশিত নিহতের সংখ্যাকে ‘গুরুতর ভুল’ দাবি করে তা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছিল আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা হাবিবে মিল্লাতের চিঠিটি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় প্যালেস দে নাসিওঁতে অবস্থিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স বর্তমানে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত নিহত ব্যক্তিদের একটি ‘যাচাইযোগ্য তালিকা’ সংকলন ও প্রকাশের জন্য বিস্তৃত নথিভিত্তিক গবেষণা উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ, জবাবদিহি, ঐতিহাসিক নির্ভুলতা এবং মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রসারে অবদান রাখা।’
সংস্থাটি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর প্রকাশিত ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহারবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করেছে জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনা ও প্রকাশনায় পরবর্তী সময়ে উদ্ধৃত প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহতের সংখ্যাটিও বিবেচনায় নিয়েছে।
চিঠিতে হাবিবে মিল্লাত বলেন, ‘এই সংখ্যার পদ্ধতি, উৎস ও গঠন নিয়ে আগেও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের কাছে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। স্বচ্ছতা ও তথ্যগত নির্ভুলতার গুরুত্ব এবং এসব ঘটনাকে ঘিরে চলমান আইনি বিতর্কের প্রেক্ষাপটে মূল তথ্যে প্রবেশাধিকার স্বাধীন গবেষক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক ও ঐতিহাসিক রেকর্ড প্রতিষ্ঠায় বড় সহায়তা করবে।’
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরকে এ সময় দুটি অনুরোধ বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।
প্রথম অনুরোধে বলা হয়, প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহতের উল্লেখিত সংখ্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বিস্তারিত তালিকা, প্রকাশযোগ্য পরিচিতিমূলক তথ্য এবং মৃত্যুর প্রাসঙ্গিক তারিখ গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্সের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
দ্বিতীয় অনুরোধ- সম্পূর্ণ তালিকাটি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো উপযুক্ত মাধ্যমে প্রকাশ করা, যেন গবেষক, নাগরিক সমাজের সংগঠন, সাংবাদিক এবং অন্য অংশীজন স্বাধীনভাবে নিজ উদ্যোগে এসব তথ্য পর্যালোচনা ও যাচাই করতে পারেন।
তথ্যের সহজ প্রাপ্যতা চলমান নথিভিত্তিক উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রমাণগত দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে উল্লেখ করে হাবিবে মিল্লাত চিঠিতে বলেন, ‘এতে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের যথাযথভাবে চিহ্নিত ও স্বীকৃতি দেওয়া নিশ্চিত হবে এবং একই সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ ও প্রমাণভিত্তিক জনআলোচনা সহজ হবে’
গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স বিষয়টির সংবেদনশীলতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার অগ্রসরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করে বলেও জানান মিল্লাত।
তিনি বলেন, ‘সত্য, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকার নিয়ে গঠনমূলক সম্পৃক্ততার মনোভাব থেকেই এই অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জুলাই অভ্যুত্থানে নিয়ে জাতিসংঘের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ‘গুরুতর ভুল তথ্য’ উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেন শেখ হাসিনার আইনজীবী ও যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের সদস্য স্টিভেন পাওলস।
পাওলস বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি নথিপত্র থেকেই এখন স্পষ্ট হয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার যে দাবি জাতিসংঘের প্রতিবেদনে করা হয়েছে, তা “অত্যন্ত ভুল ও বিভ্রান্তিকর”।’
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের অধিকাংশকে সামরিক রাইফেল ও গুলি ভর্তি শটগানের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে, যা সাধারণত বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি গেজেটের বরাতে ওই চিঠিতে পাওলস বলেন, ‘এই গেজেট এখন প্রমাণ করছে যে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৮৩৪। এমনকি সেখানে ছাত্রনেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনও নিহতের সংখ্যা ৬৫০।’
অবশ্য জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য, বিভিন্ন নাগরিক সমাজ সংগঠনের মৃত্যুর তালিকা এবং পুনরাবৃত্ত তথ্য যাচাই না করেই নিহতের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পাওলসের দাবি, যদি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত করা হয়, তাহলে প্রকৃত সংখ্যা আরও কম হতে পারে।


