গাজীপুরে ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভীর বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) এসআই ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে গাজীপুর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। দায়ের করা মামলায় সুরভীর বয়স নিয়ে বিভ্রান্তি ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ তোলা হয়েছে আইওর বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ ফজলুল মাহদী এ আদেশ দেন।
আদালত থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, এর আগে গত ৫ জানুয়ারি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেওয়া কারণ দর্শানো নোটিশ দেয় আদালত। সেই নোটিশের লিখিত জবাবসহ আদালতে হাজির হন আইও। তিনি আদালতকে জানান, গত ২৫ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী আসামিকে গ্রেপ্তার করে টঙ্গী পূর্ব থানায় হেফাজতে রাখে। পরে বিষয়টি জানানো হলে তিনি সেখানে গিয়ে আসামিকে হেফাজতে নেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদের সময় আসামি নিজেই তার বয়স ২০ বছর বলে উল্লেখ করেন। সেই বক্তব্যের ওপর বিশ্বাস করে পুলিশ ফরওয়ার্ডিংয়ে বয়স ২০ বছর লেখা হয়। বিষয়টি ভুল ছিল স্বীকার করে তিনি আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
আদালত নথি পর্যালোচনা করে বলেন, গ্রেপ্তারের পর ২৮ ডিসেম্বর আসামির জামিন আবেদন করা হলেও অভিযোগ জামিন অযোগ্য হওয়ায় তা নামঞ্জুর করা হয়। পরে পুলিশ হেফাজতে আবেদন করা হলে বিভিন্ন কারণে শুনানি পিছিয়ে ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন আসামিকে দুই দিনের পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়।
আদালত আরও বলেন, ওই শুনানির সময় আসামিপক্ষ থেকে বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ার বিষয়ে কোনো আইনি আপত্তি তোলা হয়নি। তবে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসামির বয়স ১৮ বছরের নিচে বলে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালত থেকে দেওয়া আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশু আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামির বিষয়ে শিশু আদালতের এখতিয়ার রয়েছে। এ কারণে বয়স নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র আসামির মৌখিক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে বয়স উল্লেখ করাকে আদালত তদন্তকারীর অদক্ষতা ও গাফিলতি হিসেবে দেখেছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে গাফিলতির জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত।
বাণিজ্য ও প্রতারণার অভিযোগে ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাহরিমা জান্নাত সুরভী গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও লাইভের মাধ্যমে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
পুলিশ জানিয়েছে, সম্প্রতি গুলশানের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলার ভয় দেখিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত তাহরিমা জান্নাত সুরভী।
অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় গুলশান ও বাড্ডা এলাকায় সংঘটিত একাধিক হত্যা মামলায় নাম জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ধাপে ধাপে অর্থ আদায় করা হয়।
মামলার আসামি বানানো, পুলিশি হয়রানি ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কা দেখিয়ে এবং পরে ‘মীমাংসা’ করে দেওয়ার প্রলোভনে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রটি বিভিন্ন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে মোট প্রায় ৫০ কোটি টাকা আদায় করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, কালিয়াকৈর থানায় করা একটি মামলায় তাহরিমা জান্নাত সুরভীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। ওই মামলার বাদী নাইমুর রহমান দুর্জয় নামে এক যুবক।
মামলার অভিযোগে সুরভীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অপহরণ করে অর্থ আদায় এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো গুরুতর অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া তিনি সেনাপ্রধানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতেন বলেও দাবি পুলিশের।


