চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে দায়ের হওয়া ১০০টিরও বেশি মামলার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আদালতকে বাদীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মনগড়া ঘটনা, মিথ্যা অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে প্রকৃত ঘটনার তদন্ত ব্যাহত হচ্ছে।
বেশ কিছু অদ্ভুত ঘটনায় দেখা গেছে, যাদের নিহত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে তারা বাস্তবে সুস্থ ও জীবিত আছেন। আবার কিছু মামলা হয়েছে দাম্পত্য কলহকে কেন্দ্র করে, আর কিছু মামলার বাদীকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
অধিকাংশ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাসহ শত শত পুলিশ সদস্য ও সাধারণ নাগরিকদের ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে মাসের পর মাস লেগে যাচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতে সরাসরি দায়ের করা ব্যক্তিগত মামলাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি অনিয়ম দেখা যাচ্ছে।
এদিকে, অনেক নিহতকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়। কিন্তু ময়নাতদন্তের জন্য লাশ উত্তোলনের উদ্যোগ নিলে অনেক পরিবারই তাতে বাধা দেয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ নষ্ট হয়েছে।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে দেশের ৪৩৮টি স্থানে মোট ৮৪৪ জন নিহত হন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে যাত্রাবাড়ী, সাভার, আশুলিয়া ও রংপুরে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে ১১৪ জন অজ্ঞাতপরিচয় নিহতের মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
এখন শত শত নির্দোষ ব্যক্তি নিজেদের নাম মিথ্যা মামলা থেকে বাদ দেওয়ার লড়াই করছেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩এ ধারা অনুযায়ী, মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অব্যাহতির আবেদন করতে পারেন।
টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পুলিশের সাবেক প্রধান বাহরুল আলম বলেন, ‘অনেক নির্দোষ মানুষকে আসামি করায় ফৌজদারি কার্যবিধিতে ১৭৩এ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এতে হয়রানির শিকার ব্যক্তিরা আবেদন করতে পারবেন এবং তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করতে পারবেন।’
পুলিশের মতে, থানায় দায়ের হওয়া মামলার তুলনায় আদালতে করা মামলাগুলোতে বেশি ভুয়া বাদী ও ঢালাও আসামি রয়েছে। কোথাও জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়েছে, কোথাও বাদীকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ব্যক্তিগত শত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জেরেও অনেককে হত্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
মাত্র ১৩.৬% মামলার তদন্ত নিষ্পত্তি
৩০ জুন পর্যন্ত জুলাই-আগস্ট আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মধ্যে মাত্র ২৫৪টির তদন্ত শেষ করতে পেরেছে পুলিশ। যার সার্বিক নিষ্পত্তি হার মাত্র ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
৭৯৯টি হত্যা মামলার মধ্যে মাত্র ১০০টির তদন্ত শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৬৩টিতে ৫ হাজার ৭৯৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩৭টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। হত্যা মামলার নিষ্পত্তির হার ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ।
অন্যদিকে, অ-মৃত্যুজনিত বা অন্যান্য ১ হাজার ৬৩টি মামলার মধ্যে ১৫৪টি নিষ্পত্তি হয়েছে (নিষ্পত্তির হার ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ)। ১৩৬টি মামলায় ১০ হাজার ২০২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ১৮টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
সরকারি যাচাই-বাছাইয়ে রেকর্ড থেকে ১৩টি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৃত বলে দাবি করা পাঁচজন ব্যক্তিকে জীবিত পাওয়া গেছে এবং বাকি আটজনের নাম দুবার এসেছে অথবা তাদের সঙ্গে আন্দোলনের কোনো সম্পর্কই ছিল না।
১০২টি মামলাই ভুয়া প্রমাণিত
তদন্তে ১০২টি মামলা সম্পূর্ণ ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। পুলিশ বলছে, এসব মামলা শুধুমাত্র নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
আশুলিয়ায় কুলসুম বেগম অভিযোগ করেন, তার স্বামী আল-আমিন বাইপাইলে নিহত হয়েছেন। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, আল-আমিন জীবিত।
পুলিশ তদন্ত করে দেখতে পায়, এক প্রভাবশালী স্থানীয় রাজনীতিবিদের প্ররোচনায় কুলসুম এই জালিয়াতির মামলাটি করেছিলেন এবং আসামির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা আদায় করেছিলেন।
পুলিশ তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। কিন্তু বর্তমানে কুলসুম পলাতক।
উত্তরায় গাড়িচালক মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ নিহত হওয়ার পর তার মা মামলা করেন। অথচ গোয়েন্দারা আবিষ্কার করেন, গুলিবর্ষণের ওই ঘটনার সময় মামলায় নাম থাকা প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তি অন্য স্থানে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে আসাদুল্লাহর স্ত্রী স্বীকার করেন, এই মামলা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।
আরেক ঘটনায় আহত চালক ইসরাইল মিয়া মিরপুর মডেল থানায় শেখ হাসিনাসহ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুলির মামলা করেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলায় গুরুতর অসঙ্গতি খুঁজে পাওয়ায় ইসরাইল পরে হাতিরঝিল থানায় নতুন মামলা করেন। তদন্তকারীদের সন্দেহ, প্রথম মামলাটি নিয়ে ‘মামলা বাণিজ্য’ হয়েছে।
ব্যক্তিগত শত্রুতাও ভুয়া মামলার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। ঢাকার একটি বিদেশি সংস্থার কার্যালয়ের কর্মকর্তা সারওয়ার জাহান বাপ্পী পারিবারিক বিরোধ ও বিচ্ছেদের জেরে হত্যা এবং হত্যাচেষ্টা—উভয় মামলাতেই ফেঁসে যান।
হত্যা মামলায় তাকে অব্যাহতি দিয়ে পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে এবং বংশাল থানা পুলিশ কোনো প্রমাণ না পেয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ খারিজ করে দেয়।
এ ধরনের ঢালাও মামলা তদন্তের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে।
মিরপুর-১০ গোলচত্বরে ইমন হোসেন আকাশ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর তার মা ৬৩৭ জন এজাহারনামীয় এবং ৬০ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন।
পুলিশ প্রায় দুই বছর ধরে নাম যাচাই-বাছাই করে অভিযুক্তদের মধ্যে ৫৪৯ জনের বিরুদ্ধে কোনো সত্যতা পায়নি। তাছাড়া পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য প্রমাণ অভিযোগটিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে।
এমনকি মৃত ব্যক্তিদেরও আদালতে হাজিরা দেওয়ার সমন পাঠানো হয়েছে। বরিশালে মারজুক আহমেদ নামের এক ব্যক্তি ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মারা যাওয়া চারজনসহ ২৪৮ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেন।
দোহারে আরেক ব্যবসায়ীকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়, অথচ ঘটনার সময় তিনি সিঙ্গাপুরে ছিলেন এবং গত এক দশকে দোহারেই যাননি।
এক তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আদালতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। কিন্তু অনেক মামলাতেই শুরু থেকেই এফআইআরের তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না।’
পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে ব্যাপক অসংগতি
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আদালত থেকে প্রাপ্ত মামলার প্রায় ৬৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পায়নি। ১৪২টি প্রতিবেদনের মধ্যে ৯০টিতে অভিযোগের সত্যতা মিললেও ৫২টিতে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না, ১৪টি সম্পূর্ণ বানোয়াট ছিল এবং ৩টি মামলা বাদীদের অসহযোগিতার কারণে স্থগিত রয়েছে।
দীর্ঘ আসামির তালিকা তদন্তের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘একটি দাম্পত্য বিরোধের মামলায় স্বামীর বাবা-মাকেও হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছিল। আবার যারা কখনো ঢাকায়ই আসেননি, তাদেরও রাজধানীর হত্যামামলায় জড়ানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ভুয়া মেডিকেল সনদ ও সন্দেহজনক সাক্ষ্যও পাওয়া যাচ্ছে। মিথ্যা অভিযোগকারীদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি আদালতের ওপর নির্ভর করবে।
গোয়েন্দারা সন্দেহভাজনদের অবস্থান যাচাই করতে মোবাইল কল রেকর্ড এবং সিসিটিভি ফুটেজের সাহায্য নিচ্ছেন। তদন্তে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে আসামিরা ঘটনার আশপাশেও ছিলেন না।
এদিকে জনবল সংকটও বড় সমস্যা। অনেক থানায় একজন কর্মকর্তা একই সঙ্গে ১০ থেকে ১২টি হত্যা মামলার তদন্তের পাশাপাশি নিয়মিত দাপ্তরিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
শুধু সাভার থানাতেই ৪৩টি হত্যা মামলার তদন্ত চলছে, অথচ এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামিমা পারভীন বলেন, নির্ভুল তদন্ত নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী জানান, তাদের জেলায় তদন্তাধীন ১১০টি মামলায় অভিযোগ ও আসামিদের পরিচয়ের মধ্যে ব্যাপক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
মামলা বাণিজ্য নিয়ে অভিযোগ
ভুয়া মামলা ও বিশাল আসামির তালিকা দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ব্যাপক ‘মামলা বাণিজ্য’ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বেশ কিছু ঘটনায় বাদী এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অভিযুক্তদের অব্যাহতি দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। এই চুক্তিগুলোকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে বাদীরা ৩৫০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অভিযুক্তদের ‘নির্দোষ’ ঘোষণা করে হলফনামা দিয়েছেন, যা পরবর্তীতে সরাসরি আদালত ও তদন্তকারীদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
ময়নাতদন্তে বাধা তদন্তে অচলাবস্থা
পুলিশ জোর দিয়ে বলছে যে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত অপরিহার্য, অথচ জুলাই-আগস্টের সংঘর্ষের শিকার বেশিরভাগ ভুক্তভোগীকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে। যখন আদালত ও পুলিশের নির্দেশে কবর থেকে মরদেহ তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন বিক্ষুব্ধ জনতা বারবার তাদের বাধা দেয়।
কুষ্টিয়ায় কবির হোসেন ও মোহাম্মদ জুবায়ের আহমেদ, পাবনায় জাহিদুল ইসলাম ও মাহবুব হোসেন নিলয়, জামালপুরে রিপন মিয়া এবং সাভারে আশহাবুল ইয়ামিন-এর মরদেহ উত্তোলনের উদ্যোগও একইভাবে ব্যর্থ হয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ ছাড়া প্রকৃত অপরাধীরা বিচারের সময় আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে সহজেই পার পেয়ে যেতে পারে।


