জুবায়ের তানিন, আবু ধাবি থেকে
আপনি যদি প্রথমবার আবু ধাবিতে যান, গরম নিয়ে অভিযোগ করবেন নিশ্চিত। সে আপনি এশিয়া কাপ কভার করতে যান কিংবা নেহায়েতই ঘুরতে। মরুভূমির গড়ে ওঠা এই শহরের চামড়া পোড়ানো, আত্মা জ্বালানো গরমের মধ্যেও বড় দালান দেখতে দেখতে বিষিয়ে ওঠা চোখে একটু শান্তির পরশ বুলিয়ে নিতে যেতে পারেন শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদে।
আপনি ভরদুপুরে যাবেন হয়তো, তবে খোলা আকাশকে ব্যাকড্রপে রেখে ৩০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত মার্বেল পাথরের ৮২টা গম্বুজ আর চারটা সুউচ্চ মিনারের শুভ্র মসজিদ দেখে গরমের উত্তাপ কিছুটা হলেও ভুলতে পারবেন। তবে যদি রাতে যান, তাহলে চকমকে উজ্জ্বল বাতিতে চোখ ধাধিয়ে যাবে আপনার। একই স্থান, একই মসজিদ, কিন্তু সূর্য ডুবলেই বদলে যায় আমূল।
আরব আমিরাতের স্থপতি, স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের নামানুসারে দেশটির বাকি অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মতোই এই মসজিদের নামকরণ। অবশ্য এই মসজিদটা গড়া ছিল তার স্বপ্ন। আরব আমিরাতের প্রথম রাষ্ট্রপতি চেয়েছিলেন এই মসজিদটা গড়ে উঠবে ইসলামী ঐক্য, শান্তি আর জাতিগত বৈচিত্র্যময়তার স্মারক হিসেবে। জাতিগত এই বৈচিত্র্য আপনি এখন বেশ ভালোভাবেই দেখতে পাবেন আরব আমিরাতের প্রতিটি শহরের রাস্তায়, কফি শপে, ট্যাক্সিতে কিংবা রেস্তোরাঁয়।

যদিও শেখ জায়েদ নিজে সেসব দেখে যেতে পারেননি। ১৯৯৬ সালে শুরু হওয়া এই মসজিদের কাজ শেষ হয়েছে ২০০৭ সালে। ২০০৪ সালে মারা গেছেন তিনি, চিরনিদ্রায় তাকে শায়িত করা হয়েছে গ্র্যান্ড মসজিদের কোর্টইয়ার্ডে। ১২ বছর ধরে অসংখ্য মানুষ শ্রম দিয়েছেন এই মাস্টারপিসের পেছনে। সবুজ-হীন মরুর বুকে নাম না জানা শ্রমিকদের বিন্দু বিন্দু ঘামের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে স্থাপত্যবিদ্যার কারুকলার অন্যতম এই নিদর্শন।
মুসলমানরা তো পাঁচ ওয়াক্তে নামাজ আদায় করতে যানই, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও যেতে পারেন সেখানে বিনা বাধায়। যদিও পশ্চিমা নারীদের জন্য আছে একটা নির্দিষ্ট ড্রেসকোড। আবায়া পরে ঢুকতে হয়ে মসজিদের ভেতর। বাংলাদেশে যেখানে আপনি ছোট শিশুদের মসজিদে খুব একটা দেখেন না, সেখানে গ্র্যান্ড মসজিদে অনেক শিশুকেই দেখতে পাবেন, আপনমনে খেলতে। চিৎকার-চেচামচিও তারা করে, তাতে কেউ বিরক্ত হয় না। এমনকি ফিরেও তাকায় না।

আপনি যদি আবু ধাবির রাস্তায় হেঁটে বেড়ান, তাহলে সেখানকার স্থানীয় মানুষদের দেখা পাবেন না বললেই চলে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান, ভারত ও বিভিন্ন আরব দেশের নাগরিকদের সাথে কথাবার্তা বলার সুযোগ আপনি পাবেন। এর সাথে পশ্চিমা প্রবাসীদেরও দেখতে পাবেন ত্রস্ত পায়ে ব্যস্ততা সাথে নিয়ে ছুটে বেড়াতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আবু ধাবির ৮৫% মানুষই প্রবাসী। বাকি ১০ থেকে ১৫% যা আছে, তারাই সেখানকার আদি নাগরিক, যারা বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছেন রাজধানীতে। আমিরাতিরা যে ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকেই যে গ্রহণ করে, সেটারও একটা প্রতীক এই গ্র্যান্ড মসজিদ।
১০৯৬টি কলামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ তৈরির জন্য ৪০টিরও বেশি দেশ থেকে আনা হয়েছে এর বিভিন্ন অংশ। ইতালি, গ্রিস ও মেসিডোনিয়া থেকে এসেছে মার্বেল পাথর। ৪০ হাজারের বেশি মানুষ একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। এর জন্য মসজিদের মূল অংশে বিছানো আছে হাতে বোনা বিশ্বের সবচেয়ে বড় কার্পেট। ৩৫ টন ওজনের এই কার্পেটের কার্পেটের কারিগর সবাই ইরানি। ডিজাইন করেছেন বিখ্যাত আলী খালিকি। তার নেতৃত্বে ১৩০০ কার্পেট শিল্পীর শ্রমে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বানানো হয়েছে বিশ্ব রেকর্ডধারী এই কার্পেট।

মসজিদের ইন্টেরিওরে আপনার চোখ আটকাবে নিশ্চিত। যার ঝলমলে সৌন্দর্য্যের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো বিশ্বরেকর্ড। এই যেমন মূল প্রেয়ার হলের মূল গম্বুজটার নিচে ঝুলন্ত ঝাড়বাতির ওজন ১২ টন, যা দুনিয়ায় আর কোথাও নেই। জার্মানি আর অস্ট্রিয়ার সোয়ারভস্কি ক্রিস্টাল দিয়ে বানানো এই ঝাড়বাতিগুলোতে লাগানো আছে ভারতের ইনলে স্টোন। এখানেই শেষ নয়, ঝাড়বাতিতে আছে ২৪ ক্যারেট স্বর্নের কোটিংও।
সৌন্দর্যের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক দিক থেকেও গ্র্যান্ড মসজিদ অনন্য। চাঁদের পক্ষের ওপর ভিত্তি করে বদলে যায় এর রঙও। যেদিন পূর্ণ চাঁদ থাকে, সেদিন হালকা নীলাভ বর্ণ দেখা যায় মসজিদের বাইরের অংশে। আর কৃষ্ণ পক্ষের রাতে আবির্ভূত হয় খানিকটা অন্ধকার রূপে। মসজিদ গড়তে যে মার্বেল পাথরগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেসবেরও একটা বৈজ্ঞানিক ব্যবহার আছে। আরব আমিরাতের প্রচণ্ড গরমে মসজদি ঠান্ডা রাখে সেসব, কারণ অতটা বেশি তাপ শোষণ ক্ষমতা নেই মার্বেলের।

গ্র্যান্ড মসজিদে ঢোকার পথেই নজর কাড়বে আরবি ক্যালিগ্রাফি। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত লেখা আছে দেয়ালে দেয়ালে। বিশেষত মসজিদের কিবলা দেয়ালের ক্যালিগ্রাফি। যেখানে আল্লাহর ৯৯টি নাম লেখা আছে দারুণ সব ডিজাইনে। রাতের বেলা ঢিমে তালে আলাদা করে জ্বলতেও দেখা যায় সেই ক্যালিগ্রাফিগুলো, কারণ এতে ব্যবহার করা হয়েছে ফাইভার-অপটিক ম্যাটেরিয়াল।

গম্বুজ, মেহরাব, মিনার থেকে শুরু করে পুরো ইন্টেরিওরেই আছে ক্যালিগ্রাফি শিল্পের ছোঁয়া। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ডিজাইনগুলোও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনুপ্রাণিত। একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলে জানতে পারবেন ভারতের মুঘল সাম্রাজ্য, মিশরের মামলুক সংস্কৃতি ও তুরস্কের অটোম্যানদের দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত সব। সব মিলিয়ে আবু ধাবির শেখ জায়েদ মসজিদ কেবল প্রার্থনার জায়গা নয়। সব ছাপিয়ে ঐক্য, বৈশ্বিক শিল্প ও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

