জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুর রাজ্জাক মনে করতেন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরার জন্য দলটির জাতির কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। তিনি তার লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্টোরি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ে বিষয়টি তুলে ধরেন।
শুক্রবার রাজধানীতে বইটির প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই বইয়ে জামায়াতের রাজনীতির অতীত, তাদের ভুল, সংস্কার প্রশ্নে দলটিতে একরোখা মনোভাবসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে। রাজ্জাক লিখেছেন, একাত্তরের জন্য জামায়াতের সরাসরিই ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল।
আর প্রয়াত আবদুর রাজ্জাকের এই অবস্থানকে দূরদর্শী বলে প্রশংসা করেন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, জামায়াত যদি ২০১৬ সালে আবদুর রাজ্জাকের প্রস্তুত করা খসড়া বিবৃতিটি গ্রহণ করত, তাহলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দলটির অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের সমাধান হয়ে যেত।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক ১৯৮৬ সালে জামায়াতে যোগ দেন। ধীরে ধীরে দলে তার অবস্থান পোক্ত হয় এবং এক পর্যায়ে তিনি দলটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করেন, পাশাপাশি আইনি দিকও দেখভাল করতে থাকেন।
২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের অন্যতম প্রধান আইনজীবী ছিলেন রাজ্জাক। তবে দলের ভেতরে মতভেদের এক পর্যায়ে তিনি ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর দেশ ছেড়ে চলে যান, জামায়াত থেকেও পদত্যাগ করেন।
আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থটিতে উঠে এসেছে তিনি কীভাবে বারবার দলকে একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরার জন্য বারবার ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। এমনকি ২০১৬ সালে ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদের কাছে একটি খসড়া বিবৃতি পাঠান, যাতে মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার কথা লেখা ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজ্জাক দেশে ফেরেন। পরের বছর ৪ মে তিনি মারা যান।
আইনমন্ত্রী বলেন, আদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও রাজ্জাকের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও পেশাদারি সম্পর্ক ছিল। আদালতে জুনিয়র হিসেবে তারা পাশাপাশি বসতেন। বিএনপি যখন তাকে মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক মনোনীত করে, তখন রাজ্জাক তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘ফ্যাসিবাদের’ বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর উৎসাহ দিয়েছিলেন।
বইটির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রতিক্রিয়াশীলতার বৃত্ত ভেঙে জামায়াতকে একটি প্রগতিশীল ইসলামিক দলে রূপান্তরের যে স্বপ্ন রাজ্জাকের ছিল, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে রাজ্জাকের স্ত্রী এবং দুই ছেলেও উপস্থিত ছিলেন। ছেলেরা বাবার স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য দেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক, গবেষক, শিক্ষক, সংবাদকর্মী এবং বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। তবে জামায়াত নেতাদের কেউ উপস্থিত ছিলেন না।
আইমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের অনুষ্ঠানে জামায়াতের মূলধারার নেতাদের উপস্থিতি প্রত্যাশিত ছিল। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবেই, তারা এসে দ্বিমত পোষণ করতে পারতেন। কিন্তু সমালোচনা গ্রহণ না করার মানসিকতা সঠিক নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ প্রকাশিত বইটির প্রশংসা করে বলেন, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনেক বইয়ের ভিড়ে এটি ব্যতিক্রম।’
তিনি বলেন, ‘আত্মসমালোচনার এই চর্চা শুধু জামায়াতের একার নয়; অতীত ও বর্তমান ভূমিকা নিয়ে আওয়ামী লীগসহ বৃহত্তর সমাজ ও অন্য দলগুলোরও আত্মসমালোচনার মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বইটিকে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ শীর্ষ নেতৃত্বের তরফ থেকে আসা প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মসমালোচনামূলক দলিল হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে শুধু ৭১ এর ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও, বইটির দ্বিতীয় অংশে ইসলামপন্থী রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।’
মরক্কো, তুরস্ক ও তিউনিসিয়ার উদাহরণ টেনে আলী রীয়াজ বলেন, ‘কেবল ৭১-এর জন্য ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়, জামায়াতকে আদর্শিক পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও “জনপ্রভুত্ব” এর প্রশ্নে তাদের স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।’
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ বলেন, ‘স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী কোনো দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি। সরকার গঠন করতে চাইলে জামায়াতকে এই ইতিহাসের নিষ্পত্তি করতেই হবে।’
বইটিতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক স্টিফেন র্যাপের সঙ্গে রাজ্জাকের যোগাযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা, ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের যোগাযোগের কথাও উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘জামায়াতকে টিকে থাকতে হলে নিজেদের আদর্শ নিয়ে সেক্যুলার শক্তিগুলোর সঙ্গেও সংলাপ করতে হবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপক সবচেয়ে বেশি জোর দেন নারীর অংশগ্রহণের প্রশ্নে রাজ্জাকের অবস্থানের ওপর। বইয়ের সূত্র ধরে বলেন, ‘পোশাক বা হিজাবকে সদস্যপদের বাধ্যতামূলক শর্ত করা উচিত নয়। দলের প্রতিটি স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন। একইসঙ্গে জামায়াতকে তাদের ধর্মীয় প্রচার (দাওয়াহ) এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা টানতে হবে।’
২০১২ সালে নির্বাচন কমিশনের চাপে জামায়াত তাদের সংবিধানে ‘সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ’ অংশে যে পরিবর্তন এনেছিল, তারও উল্লেখ করেন দিলারা।


